অন্যান্যরোগতত্ত্ব

আলসারে ভুগলে জেনে নিতে পারেন তার চিকিৎসা

আলসারের খাদ্যব্যবস্থা

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পেপটিক আলসারে ভুগছে এমন লোকের সংখ্যা কম নয়। আলসার বা ক্ষত পাকস্থলীতে হতে পারে অথবা ডিওডেনামে হতে পারে। পাকস্থলীতে ক্ষত হলে তাকে বলা হয় গ্যাসট্রিক আলসার এবং এক্ষেত্রে পাকস্থলী হতে স্বাভাবিকভাবে যে এসিড নিঃসরণ হয়, তার পরিমাণে তেমন তারতম্য লক্ষ্য করা যায় না অপরপক্ষে ডিওডিনাল আলসার এর ক্ষেত্রে পাকস্থলী হতে নিঃসৃত এসিডের পরিমাণ সাধারণতঃ বেশী বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।

পেপটিক আলসারের কারণসমূহঃ

বংশগত কারণঃ ভাই-বোন বা নিকট আত্নীয়দের মধ্যে আলসার রোগে ভুগতে থাকার সংখ্যা বেশী হওয়ায় ধারণা করা যায় যে এই রোগে কিছু বংশগত কারণ রয়েছে।

স্নায়ুর চাপঃ যেসব ব্যক্তি নার্ভাস ও উত্তেজিত প্তিঙ্রকা তাদের মধ্যে ভয়, দুশ্চিন্তা ইত্যাদি থাকার কারণে তাদের সহজেই পেপটিক আলসার হতে পারে। উত্তেজনার কারণে তাদের পাকস্থলীতে এসিড বেশী পরিমাণে ক্ষরিত হয় ও এর ফলে আলসার হওয়ার আশংকা থাকে।

পাকস্থলীতে অধিক ক্ষরণঃডিওডিনাল আলসারের ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে পাকস্থলীর এসিড ক্ষরণকারী কোষ এর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। কিছু ব্যক্তির এরূপ অধিক এসিড ও পেপসিন ক্ষরনের ফলে ডিওডিনাল আলসার দেখা যায়।

উত্তেজক দ্রব্যঃ ক্যাফিন, এলকোহল ইত্যাদি উত্তেজক দ্রব্য পাকস্থলী হতে এসিডের ক্ষরণ বৃদ্ধি করে। এই কারণে যেসব ব্যক্তি অত্যাধিক চা অথবা কফি অথবা মদ্যপান করে থাকে, তাদের মদ্ধ্যে পেপটিস আলসার প্রায়ই দেখা যায়।

খাদ্যঃ দরিদ্র গ্রামবাসী যারা খুব কম প্রোটিন এবং অধিক ভাত শুকনা মরিচ পোড়া বা অধিক মশলা দিয়ে খাওয়ার অভ্যাস করেন তাদের মধ্যেও পেপটিক আলসারের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। বেশী মরিচ বা মশলা যুক্ত খাবার পাকস্থলীর রস ক্ষরণ বৃদ্ধি করে।

লক্ষণঃ পেপটিক আলসার হলে পাকস্থলীর পেশির টান বৃদ্ধি পায় এবং তীব্র ক্ষুধাজনিত সংকোচন হতে থাকে। এই সময় কিছু না খেলে অর্থাৎ পেট খালি থাকলে তীব্র ব্যথা হয়।

পেপটিক আলসার

চিকিৎসাঃ এর চিকিৎসার সময়ে ৩ টি উদ্দেশ্য সামনে রেখে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়।

১। ব্যথার উপশম করা

২। আলসার বা ক্ষত শুকানো

৩। যে কারণে এই রোগটি হয়েছে সে কারণটি দূর করা। এজন্য চিকিৎসকেরা ব্যথা উপশমকারী এবং এসিড নিরপেক্ষকারী ওষুধ দিয়ে থাকেন। এর সাথে মানসিক দিক দিয়ে যেন দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকেন সেজন্য পরিপূর্ণ বিশ্রাম নেওয়া দরকার। উপযুক্ত বিশ্রাম হলে দুশ্চিন্তা ও উত্তেজনার কারণ ঘটবেনা। মদ্যপান নিষিদ্ধ করা উচিত। চা বা কফি পান করাটাও কমাতে হবে। এসময় রোগীকে উপযুক্ত খাদ্য দেওয়া অত্যন্ত জরুরী।

খাদ্যব্যবস্থাঃ পেপটিক আলসারের রোগীর জন্য সরল স্বাদের খাদ্য যেমন দুধ, ভাত, রুটি ইত্যাদি প্রয়োজন। অধিক মশলা অথবা উত্তেজক পানীয় বা খুব গরম খাদ্য সম্পূর্ণ পরিহার করা প্রয়োজন। খাদ্যমধ্যে প্রোটিন জাতীয় খাদ্য পাকস্থলীতে অধিকক্ষণ অবস্থান করায় এসিড প্রশমিত থাকে। খাদ্যের পরিমাণ অধিক না হয় এবং খাদ্য গ্রহণের সময়ের ব্যবধান বেশী না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। একসাথে অনেক ভোজন করে পরে না খেয়ে থাকা, আলসারের রোগীর জন্য ঠিক নয়। পুষ্টিগত দিক দিয়ে সুষম খাদ্যের ব্যবস্থা করতে হয়।দৈনিক পাচবার খাদ্য গ্রহণ করা ভালো। পেপটিক আলসারের রোগীর জন্য অল্প মশলা দিয়ে রান্না করা উচিত। তীব্র স্বাদ ও তীব্র গন্ধের খাদ্যবস্তু বাঞ্চনীয় নয়। এর সাথে আশযুক্ত খাদ্য যা পাকস্থলীতে আঘাত করতে পারে তা অবশ্যই বর্জনীয়।

অনুমোদিত খাদ্যঃ ১। সরু চালের ভাত, ময়দার রুটি, নুডলস, সেমাই।

২। ডাল ( কেবলমাত্র পরিষ্কার ও ভাংগা ডাল সুসিদ্ধ অবস্থায় )

৩। দুধ

৪। ডিম

৫। আশবিহীন তরকারী

৬। পরিমিত মাছ- মাংস

৭। কলা, আম ইত্যাদি মিষ্ট স্বাদের ও আশ বর্জিত ফল ও ফলের রস

৮। চর্বি ও তেল

৯। চিনি

অননুমোদিত খাদ্যঃ

১। মোটা লাল চাল, ভূষি সমেত আটা ও ভূট্টা

২। খোসা সমেত ডাল, ছোলা মটর শুটি, সিমের বিচি

৩। আশবহুল শাক-সবজি, কাঁচা পিয়াজ ও কাঁচা রসুন

৪। সকল প্রকার মশলা ও আচার

৫। ভাজা খাদ্য

৬। এলকোহল ও তদ্রুপ পানীয়

৭। টক ও আশযুক্ত ফল

৮। পান, সুপারী ও তামাক

পেপটিক আলসারের খাদ্য

পুষ্টিচাহিদাঃ পেপটিক আলসারের রোগীর পুষ্টিচাহিদার বিষয়ে নিম্নে দেওয়া হলোঃ

ক্যালরিঃ বয়স, শ্রম ও লিংগভেদে যেরূপ ক্যালরি সুস্থ ও স্বাভাবিক লোকের জন্য অনুমোদন করা হয়েছে, পেপটিক আলসারের রোগীর জন্য ও তেমনি ক্যালরি বরাদ্দ করা হয়েছে।

প্রোটিনঃ প্রোটিন বহুল খাদ্য্ যেমন দুধ, মাছ, মাংস, ডিম অধিক পরিমাণে খাওয়া দরকার। প্রোটিনের পরিমাণ বাড়িয়ে প্রতি কিলোগ্রাম ওজনের জন্য ১.৫ গ্রাম প্রোটিন খাওয়াতে হবে। পেপটিক আলসারের জন্য দুধ একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় খাদ্য। দুধে যে প্রোটিনের পরিমানই শুধু বেশী আছে, তাই নয়- দুধ উত্তেজনা উপশমকারী ও এসিড প্রশমণকারী খাদ্য।

চর্বিঃ খাদ্যে চর্বির পরিমাণও বাড়াতে হবে। মোট ক্যালরির শতকরা ৪০ ভাগ অর্থাৎ সর্বোচ্চ মাত্রায় চর্বি এই ধরনের রোগীকে দেওয়া দরকার। অধিক চর্বি ও প্রোটিন যুক্ত খাদ্য পাকস্থলীতে অধিকক্ষণ অবস্থান করার ফলে নিঃসৃত এসিড প্রশমিত থাকতে পারে।

শর্করাঃ ক্যালরি চাহিদার শতকরা প্রায় ৪০ শতাংশ শর্করা জাতীয় খাদ্য থেকে আসা উচিত। যেসকল খাদ্যশস্য ভালোমতো মসৃণ করে ছাটা সেসকল খাদ্যশস্য অর্থাৎ সাদা সরু চালের ভাত ও ময়দার রুটি খাওয়া যাবে কিন্ত লাল চাল ও আটা খাওয়া ঠিক নয়। কম আশবিশিষ্ট সবজি যেমন পেপে, লাউ, গাজর ইত্যাদি ভালো মতো সিদ্ধ করে চটকিয়ে নরম করে অল্প পরিমাণে খাওয়া যায় কিন্তু বেশী আশযুক্ত সবজি এবং কোন প্রকার শাক, কাঁচা পেয়েজ , রসুন খাওয়া উচিত নয়।

ভিটামিনঃ পেপটিক আলসারের রোগীর জন্য প্রস্তুত খাদ্যে যেন প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। খাদ্যে শাক সবজির বরাদ্দ কম হওয়ায় এদের খাদ্যে ভিটামিনের ঘাটতি ঘটার আশংকা থাকে এজন্য প্রতিদিন ১টি করে মালটি ভিটামিন ট্যাবলেট গ্রহণ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। ক্ষত আরোগ্যে ভিটামিন সি- এর ভূমিকা অত্যন্ত বেশী থাকায় পেপটিক আলসারের রোগীকে প্রতিদিন ৫০০ মিঃগ্রাঃ ভিটামিন সি দিতে হবে।

মশলাঃ পাকস্থলী ও অন্ত্রের নালীতে যে ঘা হয়, সেই ঘা বা ক্ষত স্থানে মশলা বিশেষ করে মরিচ লাগলে ক্ষত বৃদ্ধি পায়। এজন্য বেশী মশলাযুক্ত খাদ্য খাওয়া উচিত নয়।

পানীয়ঃ চা ও কফি পাকস্থলীর রস নিঃসরণ বাড়ায়, এ কারণে চা ও কফি পরিহার করা ভালো। প্রচুর দুধ দিয়ে হালকা চা অথবা কোকো, মালটভা ইত্যাদি পান করা যেতে পারে।

মদঃ সকল প্রকার এলকোহল নিষিদ্ধ।

খাদ্যব্যবস্থাঃ পেপটিক আলসার আরোগ্য করতে খাদ্যের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে আগে মনে করা হতো। ঘন্টায় ঘণ্টায় দুধ বা অন্য বিশেষ খাদ্য যা পাকস্থলী নিঃসৃত এসিডকে প্রশমিত করতে পারে এমন খাদ্যের ব্যবস্থা করা প্রধান বিষয় বলে বিবেচিত হতো। বর্তমানে এসিড প্রশমন করার জন্য ওষুধ আবিষ্কার হওয়ায় খাদ্যের ব্যাপারে কড়াকড়ির প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পেয়েছে। তবে পেপটিক আলসারের রোগীর জন্য খাদ্য প্রস্তুত করার সময় নিম্নোক্ত বিষয় সর্ম্পকে অবহিত হওয়া দরকার।

১। প্রতিবারের আহার্যে খাদ্যের পরিমাণ যেন খুব বেশি না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। যদি কোন বিশেষ খাদ্য খেলে রোগী অসুবিধা বোধ করে তবে সেই খাদ্য অবশ্যই বাদ দিতে হবে।

২। আহার্য গ্রহণগুলির মধ্যবর্তী সময় খুব যেন দীর্ঘ না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। দৈনিক ৫ বার খাদ্য গ্রহণ করা ভালো এবং প্রতিদিন নিয়মিত সময় খাদ্য গ্রহণ করা উচিত।

৩। আশযুক্ত খাদ্য পরিহার করা উচিত। আস্ত খাদ্য শস্য, ডাল ও শাকসবজি অধিক আশযুক্ত হওয়ায় এগুলি পাকস্থলীর গাত্রকে উত্তেজিত করে এবং পাকস্থলীর বিচলন কার্য বৃদ্ধি করে।

৪। তাড়াহুড়া করে খাদ্য খাওয়া ক্ষতিকর। খুব ধীরে এবং ভালো করে চিবিয়ে খাদ্য গ্রহণ করা ভালো। খাওয়ার আগে ও পরে কিছু বিশ্রাম নেওয়া ভালো।

৫। খালিপেটে এলকোহল, চা, কফি বা অন্য কোন উত্তেজক পানীয় গ্রহণ করা উচিত নয়।

৬। দুশ্চিন্তা পরিপাক কার্যকে বিঘ্নিত করে। ধূমপান ও তামাক সেবন পেপটিক আলসারের জন্য দায়ী।

৭। রোগীকে যথাযথ ঘুম ও বিশ্রাম নিতে হবে এবং সবসময় দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে হবে।

আরো পড়ুনঃ

ডায়রিয়া হলে হতাশ না হয়ে চিকিৎসা জানুন

কিডনি এবং পাকস্থলী সুস্থ রাখার উপায়

গ্যাস্ট্রিক বা গ্যাসট্রাইটিস রোগের উপশম

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button