অন্যান্যরোগতত্ত্ব

ইউরিনারি ইনফেকশনের কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার

ইউরিনারি ইনফেকশন

ইউরিনারি ইনফেকশন বর্তমান দুনিয়ার একটি খুবই পরিচিত সমস্যা। মানুষের শরীর দুইটি কিডনি, দুইটি ইউরিনারি ব্লাডার, দুইটি ইউরেটার ও ইউরেথ্রা নিয়ে গঠিত। এগুলো সব মিলেই গঠিত হয় মূত্রতন্ত্র। আর এই মূত্রতন্ত্রের যেকোন অংশে যদি একইসঙ্গে কোন জীবাণুর সংক্রমণ ঘটে তাহলে তাকে ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বলে। কিডনি, মূত্রনালি একাধিক অংশে ও এই ধরনের সমস্যা বা ইনফেকশন হতে পারে। এই ইনফেকশনকে ইউরিনারি ইনফেকশন বলা হয়।

প্রসাবে সংক্রমণ অনেকেরই হয়ে থাকে। কেউ কেউ আবার নিয়মিত প্রসাবের ইনফেকশনে ভোগে। নারী পুরুষ উভয়েরই ইউরিন ইনফেকশন হতে পারে। তবে পুরুষদের তুলনায় নারীদের ইউরিনে ইনফেকশন বেশি হতে দেখা যায়। ইউরিনে সংক্রমণ হলে প্রসাব করার সময় খুব বেশি জ্বালাপোড়া হয়।

পুরুষের সাথে নারীর মূত্রতন্ত্রের গঠনগত পার্থ্যকের কারণে নারীদের জীবদ্দশায় প্রসাবের সংক্রমণ হতে পারে ৫০ শতাংশ। তবে পুরুষ ও শিশুদের সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনাও কম নয়। দীর্ঘদিন এই রোগে ভুগতে থাকলে কিডনিতে সমস্যা হতে পারে। কিডনি বিকল হয়ে যেতে পারে। আবার মৃতুঝুকিও প্রবল পরিমাণে।

বন্ড গার্ল খ্যাত মার্কিন অভিনেত্রী ও মডেল তানিয়া রবার্টস দীর্ঘদিন ধরে ইউরিনারি ইনফেকশনে ভুগে ৬৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নারীদের মতোই বাংলাদেশের নারীরাও এই রোগে ভুগে থাকেন।

প্রস্রাব সংক্রমণের রোগে অনেক নারীই ভোগেন। কিছু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার কারণে এটি হয়ে থাকে। সময় মতো চিকিৎসকের পরামর্শ না নিলে শরীরে আরো নানা সমস্যা জন্ম নিতে পারে।

ইউরিনারি ইনফেকশনের কারণ-

১। যেকোন ধরনের সংক্রমণ ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে হয়ে থাকে। তেমনি প্রসাবের সংক্রমণ ও ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে হয়ে থাকে। অনেক অনেক ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া এই সংক্রমণের জন্য দায়ী।

২। অনেক সময় মেয়েরা কোথাও গেলে যেমন তাদের কর্মস্থল বা নতুন কোন জায়গায় বেড়াতে গেলে প্রসাব চেপে রাখে। ফলে এ থেকে ইউরিনের সংক্রমণ হতে পারে।

৩। প্রসাবের পরে ছেলে মেয়ে উভয়কেই খুব ভালো করে প্রসাবের জায়গাটি পরিষ্কার করতে হবে। মেয়েদেরকে বিশেষ করে ভ্যাজাইনা ভালো করে পরিষ্কার করতে হবে।

৪। ছোট বাচ্চা শিশুদেরকে যদি প্রসাব ও পায়খানা করার পর ভালোমতো না পরিষ্কার করিয়ে দেওয়া হয় তাহলে তাদের ইউরিন ইনফেকশন হতে পারে।

৫। স্ত্রী ও পুরুষের যৌনমিলনের আগে ও পরে যদি জায়গাটি ভালো মতো পরিষ্কার করা না হয় তাহলে এধরনের ইনফেকশন হতে পারে।

৬। আবার ব্যাকটেরিয়া ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের ছত্রাকের আক্রমণের ফলেও এই ইউরিন ইনফেকশন হতে পারে।

৭। এছাড়াও শারীরিক গঠন, যৌন মিলন , স্থূলতা, বহুমূত্র রোগ ও বংশগত বিভিন্ন কারণে ইউরিন ইনফেকশন হতে পারে।

ইউরিন ইনফেকশন

ইউরিনারি ইনফেকশনের লক্ষণ-

১। প্রসাবে জ্বালাপোড়া করা

২। ঘন ঘন প্রসাবের বেগ

৩। প্রসাবে বাজে গন্ধ

৪। প্রসাব গাঢ় হলুদ বা লালচে হওয়া

৫। প্রসাবের সাথে রক্ত

৬। তলপেটে বা পিঠে প্রচন্ড ব্যথা

৭। নারীদের গোপনাঙ্গে ব্যথা

৮। পুরুষদের মলদ্বারে ব্যথা

৯। বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া

১০। কিছু সময় পর পর প্রসাব লাগলেও প্রসাব না হওয়া

১১। সারাক্ষণ জ্বর বা কাপুনি দিয়ে জ্বর আসা

নারী পুরুষ উভয়েরই ইউরিনারি ইনফেকশন হলেও নারীদের খুব বেশি এই ইনফেকশন দেখা দেয়। বিশেষ করে গরমের দিনে এই ইউরিনারি ইনফেকশন খুব বেশি হতে দেখা যায়।

ইউরিনারি ইনফেকশনের প্রতিকার-

১। ইউরিনারি ইনফেকশন থেকে রক্ষা পাওয়ার একটি প্রধান ঔষধ হচ্ছে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা। প্রসাব সামান্য একটু হলুদ হয়ে গেলেই পানি পান করতে হবে অনেক বেশি করে।

২। ইউরিনারি ইনফেকশন হলে বেশির ভাগ চিকিৎসকেরা রোগীকে ভিটামিন সি দেওয়ার পরামর্শ দেন। এটি মূত্রথলি সুস্থ রাখে ও প্রসাব হলুদ হওয়া থেকে রক্ষা করে। আবার যেসব ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া আক্রমণের ফলে ইনফেকশন দেখা দিয়েছে সেসব ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে ভিটামিন সি। তাই এই ইনফেকশন হলেই ভিটামিন সি খাওয়া উচিত।

৩। রক্তে শর্করার আধিক্য দেখা দিলেও ইউরিনারি ইনফেকশন দেখা দেয়। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের সর্বদা শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

৪। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা মেনে চলতে হবে। টয়লেট ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। বাড়ির বাইরে টয়লেট ব্যবহারে কোন সংকোচ থাকলে চলবে না। তাহলে এই ইউরিনারি ইনফেকশন কমানো যাবে।

৫। আনারসে ব্রোমেলাইন নামক এনজাইম থাকে। ইউরিনারি ইনফেকশন হলে রোগীদের ব্রোমেলাইন সমৃদ্ধ অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। তাই এই ইনফেকশন হলে প্রতিদিন আনারস খাওয়া যেতে পারে।

৬। ইউরিনারি ইনফেকশন হলে মাত্র দুই থেকে তিন দিনের মাঝে কিডনিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই দ্রুতই এই চিকিৎসা করতে হবে। আধা চামচ বেকিং পাউডার এক গ্লাস পানিতে মিশিয়ে দিনে একবার খেলে প্রসাবের জ্বালাপোড়া কমে যায়।

৭। নিয়মিত খুব ভালো মতো গোসল করতে হবে।

৮। একই অর্ন্তবাস দীর্ঘসময় পড়ে থাকা যাবে না।

৯। ময়লা কাপড় পরিধান করা যাবে না। কাপড় ময়লা হলে ধুয়ে নিতে হবে।

১০। শসা খান নিয়মিত। শসা খেলে মূত্র বর্ধক হয়।

১১। গরম পানির ব্যাগে পানি গরম করে রেখে দিতে পারে। গরম পানি তলপেটে সেক দিলে মূত্র বর্ধন হয় ভালো।

১২। সেলারি বীজ মূত্রবর্ধন করে। এক মুঠো সেলারি বীজ চিবিয়ে খাওয়া যেতে পারে আবার এক কাপ গরম পানিতে কিছু বীজ দিয়ে ঢেকে ৮ মিনিট পর ছেঁকে নিয়ে পান করতে হবে। তাহলে ইউরিনারি ইনফেকশন প্রতিরোধ করা যাবে।

ইউরিনারি ইনফেকশন ছাড়াও অন্যান্য অনেক কারণেই প্রসাবে জ্বলাপোড়া হতে পারে। তাই আন্দাজে কিছু না জেনেই দোকান থেকে অ্যান্টিবায়োটিক এনে খাওয়া যাবে না। তাহলে হীতে বিপরিত হতে পারে।

আরো পড়ুনঃ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
error: Content is protected !!

Adblock Detected

Please turn off your Adblocker.