খাদ্য ও স্বাস্থ্যকথাস্বাস্থ্য টিপস

একই তেল বারবার ব্যবহার করা কতোটা ভয়াবহ?

একই তেলের পুনরায় ব্যবহার

যেকোন ভাজাভুজি ভাজার পর আবার সেই তেল দিয়েই অন্যান্য অনেক কিছু রান্না করা হয়। সেই তেল আবার থেকে গেলে তা দিয়ে অন্যান্য খাবার রান্না করা হয়। এমনটা অনেক বাড়িতেই করা হয়ে থাকে।

আবার আমরা এখন অনেক বেশি বাইরের খাবার অর্থাৎ রেস্টুরেন্টের খাবার খাই। বাইরের প্রতিটা খাবারেই তেল ব্যবহার করা হয় অনেক বেশি। সেসব তেল থাকে অনেক দিনের পুরোনো। আমরা টাকা পয়সা খরচ করে বাইরের খাবার খাই আবার অসুস্থ ও হয়ে পড়ি।

মূলত বাইরের এসব তেলেভাজা খাবার খেলে আমাদের হার্টের সমস্যা, গ্যাস্ট্রিক সহ আরো অনেক রোগ হতে পারে। এসব বাইরের তেলেভাজা খাবার খাওয়া আমাদের শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকর। বারবার একই তেল ব্যবহার করলে সেই তেল বিষাক্ত হয়ে যায়। ফলে শরীরে বিভিন প্রদাহ সৃষ্টি হয়। এ থেকে শরীরে কঠিন অসুখ দেখা দেয়।

এসব ভাজাভুজিতে ব্যবহার করা তেল পুনরায় ব্যবহার করা নিয়ে ধাবা, হোটেল, রেস্টুরেন্ট এর উপর সতর্কতা জারি করা হয়েছে। FSSAI ( Food Safety and Standards Authority of India) বা জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা ও মান নির্ণায়ক সংস্থা নতুন আইন জারি করেছে যে, একই তেল তিনবারের বেশি ব্যবহার নিষিদ্ধ। এমন করলে ট্রান্স ফ্যাট তৈরী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একই তেল বারবার ব্যবহার করলে যখন তেল গরম করা হয় তখন ফ্যাটের কণা ভাঙ্গতে থাকে। ফলে এতে কিছু বিষাক্ত পর্দাথ তৈরী হয়। কোলেস্টেরলের মাত্রাও বৃদ্ধি পায়। রক্তচাপের পরিমাণ ও বৃদ্ধি পায়।

যেসব হোটেল বা রেস্তোরাতে দিনে ৫০ লিটার বা তার বেশি তেল ব্যবহার করা হয় তাদের কর্তৃপক্ষকে রেকর্ড রাখতে হবে। কোন সময় কতোটা তেল ব্যবহার করা হচ্ছে তা ও নিয়ম করে FSSAI কে পাঠাতে হবে। ২০০৬ সালের ফুড সেফটি এন্ড স্ট্যান্ডার্ড আইন অনু্যায়ী এই আইনটি চালু করা হয়েছে। এই আইনে বলা হয়েছে, একবার ব্যবহার করা তেল ১-২ দিনের মধ্যে ব্যবহার করতে হবে।

তেল যতবেশি পুরোনো হবে ততই তা শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর হবে। তেলের রং যদি নীলচে-ধূসর হয়ে যায় বা ফেনা দেখা যায় তাহলে তা ফেলে দিতে হবে।

একই তেল বারবার ব্যবহার করলে কি ধরনের ক্ষতি হতে পারে-

একই তেল বার বার করে গরম করলে একটি দূর্গন্ধযুক্ত বিষাক্ত পদার্থ নির্গত হয়। প্রতিবার তেল গরম করলে ফ্যাট মলিকিউল ভেঙ্গে যায়। ফলে সেই তেল থেকে একটি বাজে দূর্গন্ধ বের হয়। শুধুমাত্র রান্না করলেই নয় বাতাসেও সেই তেলের বিষাক্ত গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এগুলো আমাদের শরীরের ও পরিবেশের জন্য খুবই ক্ষতিকারক।

কড়া ভাজার পর ঐ তেল আবার ব্যবহার করতে গেলে দূষিত হয়ে যায়। এতে ইনফ্লামেশন ঘটে ও পরিণামে রোগব্যধি ছড়ায়। দূষিত উপাদানগুলো দেহের মাঝে ছড়ায় ও তখন ক্যান্সার হতে পারে। অ্যাথোরোক্লেরোসিস হতে পারে। দেহের ক্ষতিকারক এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। ফলে রক্তবাহী শিরা-উপশিরায় রক্তপ্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়।

এছাড়াও এ্যাসিডিটি, আলঝেইমার্স, পারকিনসন্স ও কন্ঠনালিতে অসুবিধা দেখা দিতে পারে। তাই একবার ব্যবহার করার পরে তেল পুনরায় ব্যবহার করতে হলে ভেবে চিনতে করা উচিত।

উচ্চ রক্তচাপের ঝুকি বাড়ায়-

খাবারের মাঝে আর্দ্রতা, বায়ুমন্ডলীয় অক্সিজেন, উচ্চ তাপমাত্রা হাইড্রোলাইসিস, জারণ ও পলিমারাইজাইশেনের মতো বিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এই বিক্রিয়ার ফলে তেলের রাসায়নিক গঠন পরিবর্তন হয়ে মনোগ্লিসারাইড, ডাইগ্লিসারাইড ও ট্রাইগ্লিসারাইড সৃষ্টি করে। এগুলো পোলার যৌগের অধীনে যেয়ে রান্নার তেলের অবনতি ঘটায়। ফলে বার বার একই তেল ব্যবহার করলে হাইপারটেনশন ঘটায়।

হৃদরোগের ঝুকি বাড়ায়

উচ্চ তাপমাত্রায় তেল ট্রান্স ফ্যাটে পরিবর্তিত হয়। এই ফ্যাট শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকর। হার্টের সমস্যা ও হৃদরোগ সৃষ্টি করে। তেলে স্বাভাবিক অবস্থায়ই ট্রান্স ফ্যাট থাকে। আবার যদি বারবার করে ব্যবহার করা হয় তাহলে ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পায়।

তেল আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য সবসময় খুবই ক্ষতিকর। তেলের অপচয় রোধ করতে আমরা একই তেল বার বার করে ব্যবহার করে থাকি। এতে তেলের স্বাস্থ্য গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়। তবে তেল পুর্নব্যাবহারে আছে কিছু টিপস-

একবার রান্না করার পর তেল ফেলে দিলে অপচয় হয়ে যায় তাই আগের তেল পুনরায় ব্যবহার করা যায়। তবে তা স্বাস্থ্যসম্মত ভাবে ব্যবহার করতে হয়। বেঁচে যাওয়া তেল প্রথমে ঠান্ডা করে নিতে হবে। তারপর এটি বাতাস প্রবেশ করতে পারে না এমন বোতলে সংরক্ষণ করতে হবে। ফলে যেসব খাদ্যকণা তেলে থেকে যায় সেগুলো তেলকে খুব বেশি নষ্ট করতে পারে না। তেল একবার ব্যবহার করার পর ঘনত্ব ও রং দেখতে হবে। রং যদি গাঢ় ও ঘনত্ব গ্রিজের মতো হয়ে যায় তাহলে সেই তেল ফেলে দিতে হবে।

ভারতীয় পুষ্টিবিদ বিজয়া আগরোয়াল জানান, একমাত্র নারকেল তেলের স্মোক পয়েন্ট বেশি বলে বহুক্ষণ উচ্চতাপে গরম করলেও তা অবিকৃত থাকে ও বিপদ কম হয়। তবে সবসময় নারকেল তেলেই ভাজা খেতে হবে এমন নয়। মাঝে মাঝে অন্য তেলেও ভাজা খাওয়া যেতে পারে। তবে অনেক তেল দিয়ে না ভেজে খাবার একটু তেল দিয়ে ঢাকা দিয়ে ভেজে খেতে পারেন। অথবা এয়ার ফ্রাইয়ার ব্যবহার করতে পারেন।

তেলে ভাজা খাবার

পোড়া তেল কি করতে পারেন ?

পোড়া তেল মূলত কতবার ব্যবহার করা যায় তা কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। যেমন- কোন তেলে কত তাপমাত্রায় ভাজা হয়েছে, তেল কতক্ষণ গরম হয়েছে ও ঠান্ডা হওয়ার পর তেল কিভাবে রাখা হয় তার উপর নির্ভর করে। সানফ্লাওয়ার, সর্ষে, তিল, নারকেল ও ক্যানোলা উউচতাপমাত্রায় ঠিক থাকে। তাই মাঝারি তাপমাত্রায় কিছুসময় ডিপ ফ্রাই করলে এই তেল ঠিক থাকে। তবে ব্যবহার করা তেল ছেকে নিতে হবে। তেল ঘোলা হয়ে গেলে তার মাঝে ক্ষতিকর জৈব পদার্থ আছে বুঝতে হবে। তাই সেই তেল ফেলে দিতে হবে। সয়াবিন তেল একবার ব্যবহার করার পর আর রান্নার কাজে ব্যবহার করা যাবে না।

পোড়া তেল পুনরায় ব্যবহার করতে হলে যেসব বিষয় খেয়াল রাখতে হবে-

১। রান্নার পর পুনরায় সেই তেল ব্যবহার করতে হলে একটি বায়ুরোধী পাত্রে সংরক্ষণ করতে হবে। পাত্রে ঢালার আগে ছেঁকে ঢালতে হবে। তাহলে খাবারের অবশিষ্টাংশ থাকবে না। নাহলে তেল দ্রুত নষ্ট হয়ে যেত।

২। পোড়া তেল আবার ব্যবহার করার সময় যদি বেশি ধোয়া হয় তাহলে ওই তেল বাতিল করে দিতে হবে। কারণ ঐ তেলে বিষাক্ত পদার্থ জমা হয়েছে। যা খেলে আমাদের শরীরে অসুবিধা হতে পারে।

৩। পোড়া তেল আবার ব্যবহার করতে হলে তেলের ঘনত্ব ও রং পরীক্ষা করে নিতে হবে। তেলের রং যদি স্বাভাবিকের তুলনায় গাঢ় হয় তাহলে বুঝতে হবে তেলের মাঝে কিছু জমেছে।

৪। জলপাই বা অলিভ ওয়েল থেকে অনেক দেরিতে ধোয়া হয় তাহলে তা পুনরায় না ব্যবহার করাই ভালো। হালকা ভাজি করার জন্য এই তেল ব্যবহার করা হয়। উচ্চ তাপমাত্রায় কোন খাবার রান্না করতে এই তেল ব্যবহার না করাই ভালো।

আরো পড়ুনঃ.

নন-স্টিকের পাত্রে রান্না করা খাবার খেলে কি হয় দেখুন?

একটি সবজি যা টিকার বিকল্প হিসাবে কাজ করবে

মুখের দূর্গন্ধ দূর করার ঘরোয়া উপায়

আদা ও আদা, রসুন বাটা সংরক্ষণ পদ্ধতি

ফ্রিজে খাবার রাখার সময় যেসব বিষয় মানতে হবে

বুফেতে যেসব খাবার বর্জন করা উচিত

যে পাচটি খাবারে হার্ট অ্যাটাকের ঝুকি কমাবে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
error: Content is protected !!

Adblock Detected

Please turn off your Adblocker.