অন্যান্যরোগতত্ত্ব
Trending

ডেঙ্গু জ্বরের কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার

ডেঙ্গু জ্বরের কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার

মহামারী করোনার এই সময়ে রাজধানীতে ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াবহতা দেখা দিচ্ছে। প্রতিদিনই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে শত শত মানুষ। এইসময় সাধারণত কারো জ্বর হলেই ভাবছে করোনা হয়েছে। শুধু যে করোনা আক্রান্ত হলেই জ্বর হবে এমনটা এখন আর এখন কেউ ভাবছে না। ফলে ডেঙ্গু টেস্ট না করানোর ফলে মারাত্নক আকার ধারণ করছে।

ডেঙ্গু জ্বর সম্পর্কে কথা বলার আগেই আমাদের জানতে হবে ডেঙ্গু জ্বর আসলে কি?

ডেঙ্গু জ্বরঃ ডেঙ্গু জ্বর একটি এডিস মশা বাহিত ডেঙ্গু ভাইরাস জনিত গ্রীষ্মকালীন রোগ। এই রোগ এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে হয়ে থাকে। সাধারণত তিন থেকে পনেরো দিনের মাঝে এই রোগের উপসর্গ গুলো প্রকাশ পায়। আবার দুই থেকে সাতদিনের মাঝে রোগী আরোগ্য লাভ করে।

কোন কোন সময় আবার রোগটি মারাত্নক রক্তক্ষয়ী রূপ নিতে পারে। তখন রক্তপাত হয়, রক্তের অণুচক্রিকা কমে যায় ও রক্তের প্লাজমার নিঃসরণ ঘটে।

কয়েক প্রজাতির এডিস মশা ডেঙ্গু জ্বরের প্রধান বাহক। যেগুলোর মাঝে এডিস ইজিপ্টি মশকী অন্যতম। ডেঙ্গু জ্বর মূলত স্ত্রী মসার কামড়ের ফলে হয়ে থাকে।

ডেঙ্গু জ্বরের কারণ

ডেঙ্গু মশা ডিইএনভি নামের ভাইরাসের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত চারটি ভাইরাসের মদ্ধ্যে একটি ভাইরাসের দ্বারা সংক্রমিত হয়ে ডেঙ্গু জ্বর সৃষ্টি করে। এডিস মধা চারটির মাঝে যেকোন একটি ভাইরাসের বাহক হতে পারে। একটি ব্যক্তি তার মধ্যে সেই নির্দিষ্ট ভাইরাসের দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে।

এডিস মশা মূলত বাড়ির বাইরে বা ভিতরে যেকোন পাত্রে জমে থাকা পানিতে প্রজনন করে ও এই মশা তার জন্মস্থান থেকে ২০০ মিটারের বেশি দূরে ঊড়তে পারে না।

এই মশা পুকুরে, খালে, নদীতে বা অন্য কোন জলাশয়ে প্রজনন করতে পারে না। এডিস মশা ভোরবেলা ও বিকালের দিকে বেশি সক্রিয় হয়ে থাকে।

যখন এডিস মশা একটি সুস্থ ব্যক্তিকে কামড়ায় তখন সেই ভাইরাস সেই ব্যক্তির মাঝে ছড়ায় ফলে যখন ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত নয় এমন কোন মশা ঐ ব্যক্তিকে কামড়ায় তখন সেই মশাটি ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক হয়ে যায়। এভাবে ডেঙ্গু ভাইরাস এক দেহ থেকে অন্য দেহে ছড়িয়ে পড়ে।

যে ব্যক্তি একবার কোন একটি ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে সে পরবর্তীতে অন্য কোন ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। তবে আগে তাকে যেই ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রমিত করেছিল সে পরবর্তীতে আর কোনদিন ওই ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হতে পারবে না। প্রথম ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে দ্বিতীয় ভাইরাসের সংক্রমণ অনেক বেশি মারাত্নক ও তীব্র হয়। বিশ্বের ৪০ শতাংশ মানুষ ডেঙ্গু সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনাময় স্থলে বসবাস করে।

ডেঙ্গু জ্বর কখন ও কাদের হয়?

মে থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত গরম ও বর্ষার সময়ে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বেশি দেখা যায়। শীতের সময়ে এই জ্বর খুব বেশি হয় না। শীতে লার্ভা হয়ে ডেঙ্গু জ্বর অনেক দিন বাচতে পারে। বর্ষার শুরুতে সেগুলো ডেঙ্গু মশাতে রুপান্তরিত হয়ে থাকে।

শহর অঞ্চলের অভিজাত এলাকায়, বড় বড় দালান কোঠায় ডেঙ্গু মশা খুব বেশি দেখা যায়। গ্রামে ডেঙ্গু মশা সবসময় খুব কম দেখা যায়।

আগেই বলা হয়েছে ডেঙ্গু ভাইরাস ৪ ধরনের হয়ে থাকে। যাদের আগেও একবার কোন একটি ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা আক্রমণ করেছিল তাদের আবার যেকোন একটি ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। শিশুদের ডেঙ্গু জ্বর বেশি হতে দেখা যায়।

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ

ক্ল্যাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বর হলে খুব বেশি জ্বর ও সাথে শরীরে খুব বেশি ব্যথা দেখা যায়। জ্বর ১০৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট হয়ে থাকে। শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা যেমন- হাড়, কোমর, পিঠ, অস্থি সন্ধি ও মাংসপেশিতে খুব বেশি ব্যথা হয়। এসময় মাথা ব্যথা ও চোখের পিছনে ব্যথা হয়। এসময় অনেক ক্ষেত্রে ব্যথা এতো বেশি হয় যেন হাড় ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম। তাই এই জ্বরের আরেক নাম ব্রেক বোন ফিভার।

জ্বর হওয়ার ৪ বা ৫ দিনের মাঝে সারা শরীরে লালচে দানা বা র‍্যাশ দেখা যায় যা এলার্জি বা ঘামাচির মতো হয়ে থাকে। রোগী খুব বেশি ক্লান্তবোধ করে ও খাবারে অরুচি দেখা যায়। বমি বমি ভাব হয়। এমনকি বমিও হতে পারে। সাধারণত জ্বর ৪ বা ৫ দিন থেকে চলে যায়। আবার ২ বা ৩ দিন পরে জ্বর চলে আসে। তাই এই জ্বরকে বাই ফেজিক ফিভার বলা হয়।

ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর :

ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর অনেকটা জটিল হয়ে থাকে। ক্ল্যাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গের সাথে আর কিছু উপসর্গ এসময় দেখা যায়। যেমন-

  • এই রোগ হলে অনেকসময় বুকে ও পেটে পানি জমতে পারে।
  • লিভার আক্রান্ত হয়ে রোগীর জন্ডিস, কিডনীতে আক্রান্ত হয়ে রেনাল ফেইলিউরসহ আরো বিভিন্ন জটিলতা দেখা যায়।
  • শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্ত পড়তে থাকে যেমন- চামড়ার নিচে, নাকে, মুখে, মাড়ি দিয়ে, দাঁত দিয়ে, কফের সাথে রক্তবমি হতে পারে।
  • পায়খানার সাথে তাজা রক্ত বা কালো পায়খানা হতে পারে।
  • মহিলাদের ক্ষেত্রে অসময়ে ঋতুস্রাব বা রক্তপাত শুরু হলে অনেক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

ডেঙ্গু শক সিনড্রোম :

ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াবহ রূপ হলো ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। এর বিভিন্ন লক্ষণ প্রকাশ পায়। যেমন-

  • রক্তচাপ হঠাত করেই কমে যাওয়া।
  • প্রস্রাব কমে যাওয়া।
  • হঠাত করেই রোগী জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এমনকি মৃত্যু ও হতে পারে।
  • নারীর স্পন্দন কমে যাওয়া ও দ্রুত হওয়া।
  • শরীরের হাত ও পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া।

ডেঙ্গু জ্বরে কখন রোগীকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে?

ডেঙ্গু জ্বরের আলাদা করে কোণ চিকিৎসা নেই। এই জ্বর সাধারণত নিজের থেকেই ভালো হয়ে যায়। তাই সাধারণভাবে চিকিৎসা করালেই চলে। তবে কিছু কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুতই চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। যেমন-

  • শরীরের যেকোন অংশ থেকে রক্তপাত।
  • প্লাটিলেটের মাত্রা কমে যাওয়া।
  • প্রসাবের পরিমাণ কমে গেলে
  • জন্ডিস হলে
  • প্রচন্ড পেটে ব্যথা বা বমি হলে
  • অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দূর্বলতা দেখা দিলে
  • শ্বাসকষ্ট হলে বা পেট ফুলে পানি আসলে।

ডেঙ্গু জ্বর দেখা দিলে মূলত বিশেষজ্ঞ চিকিতসকের কাছে নিয়ে যাওয়াটাই ভালো। চিকিতসক রোগ নির্ণয়ের জন্য যেসব চেকআপ করতে দিবেন সেগুলো প্রতিষ্ঠিত কোন ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে করানোই ভালো। এসব পরীক্ষা এখন অনেক জায়গাতেই করা হয় কিন্তু মানহীন কিট, রি-এজেন্ট দ্বারা পরীক্কখা করলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

রোগ ধরা না পড়লে যেমন ক্ষতি তেমনি ভুল রোগ নির্ণয় করলে সেটাও ক্ষতি। ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসার ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতাল সবসময় ভালো। সরকারি হাসপাতালে যেকোন সময় সেবা পাওয়া যায়।

ডেঙ্গু রোগ হলে রক্তের প্রয়োজন হয়। যে ব্যক্তি রক্ত দিবেন তার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হবে যেমন-

  • রক্ত জমাট না বাধার কোন ওষুধ খেলে সে ব্যক্তি ৪৮ ঘন্টার মাঝে রক্ত দিতে পারবেন না।
  • একেবারে খালি পেটে রক্ত দেওয়া যাবে না।
  • কারো প্লাটিলেট লাগলে রক্তদাতাকে দুই ঘন্টার মাঝে ভারী খাবার দেওয়া যাবে না। এতে প্লাটিলেটের কার্যকারিতা কমে যাবে।

ঘরে চিকিৎসা নিতে করণীয়

  • পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে।
  • স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি তুরল খাবার যেমন- খাবার স্যালাইন, ফলের রস, স্যুপ, বার্লি, গ্লুকোজ, ডাবের পানি ইত্যাদি দিতে হবে।

আরো পড়ুনঃ

বর্ষাকালে পোকামাকড়ের উপদ্রব থেকে বাচতে করণীয়।

পানিশূণ্যতার লক্ষণ ও প্রতিকার

ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের উপসর্গ ও লক্ষণ

   

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
error: Content is protected !!

Adblock Detected

Please turn off your Adblocker.