খাদ্য ও খাদ্যাভ্যাস

পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী খাবার

পাহাড়ি কিছু ঐতিহ্যবাহী খাবার

বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল যেন এই দেশের মাঝেই আরেকটি দেশ। এই এলাকার ভূপ্রকৃতি, খ্যাদ্যভ্যাস, পোশাক, ভাষা সব কিছুতেই পাহাড়ীদের আলাদা সংস্কৃতি। তাদের সমস্ত জীবনযাত্রাই সহজ সরল কিন্তু তাদের জীবন আবার সাথে সাথে সমান বৈচিত্র্যপূর্ণ।

পাহাড়িদের সমস্ত জীবন যখন সাধারণের তুলনায় অন্যরকম। তাই তাদের খাদ্য ও অন্যরকম। পাহাড়ি খাবার অনেকটাই ভিন্ন বাংগালীদের থেকে। পাহাড়ি খাবারের প্রতি বাঙালিদের শুরু থেকেই অনেক কৌতুহল।

আজ আমরা পাহাড়ি কিছু খাবার নিয়ে আলোচনা করবো।

প্রথমেই বলে রাখি পাহাড়িদের খাবার কিন্তু বেশ সুস্বাদু ও আর্কষণীয়। বাঙালিদের খাদ্যের সাথে পাহাড়িদের খাদ্যের বেশ পার্থক্য রয়েছে। বাঙালিরা খাবারে খুব বেশি তেল মশলা ব্যবহার করে কিন্তু পাহাড়িরা খাবারে খুব কম তেল মশলা ব্যবহার করে। তাদের সাথে আমাদের খাবার রান্না, উপকরণে রয়েছে অনেক পার্থক্য।

যারা একবার পাহাড়ে গেছে তারা আবার পাহাড়িদের খাবার খাওয়ার জন্যই শুধু পাহাড়ে যান। কিন্তু পাহাড়ি খাবারের জন্য কর্মব্যস্ত মানুষ সবসময় পাহাড়ে যেতে পারেন না। তাই কিছু খাবার সম্পর্কে ধারণা থাকলে আমরা নিজেরাই বাসায় এসব খাবার বানিয়ে নিতে পারবো।

আরো পড়ুনঃ বাংলাদেশের আঞ্চলিক খাবার

বাশ কোড়লঃ

পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের একটা প্রিয় খাবার বাশ কোড়ল। কচি বাশ দিয়ে রান্না করা হয় এই খাদ্য। চাকমা ভাষায় এর নাম হুররো, মারমা ভাষায় লাকসু। এই খাবার হাত চেটে খাওয়ার মতো একটি খাবার। স্যুপ, মুন্ডি, মাংস দিয়ে বা শুধু ভাজি করেও এই খাবার খাওয়া হয়। বর্ষার শুরুতে নরম মাটিতে বাশ গজাতে শুরু করে। তখনি এই বাশ কোড়ল খাওয়া হয়। শুধুমাত্র বর্ষাতেই এটি পাওয়া যায়।

আরো পড়ুনঃ ভোজন রসিক বাঙ্গালি ও তার রসনা বিলাসের চিরাচরিত অভ্যাসের সাতকাহন

ব্যাম্বু চিকেন

পাহাড়ের একটা জনপ্রিয় খাবার হলো সুমো হুরো এরা বা ব্যাম্বু চিকেন। বাশের মধ্যে রান্না করা হয় বলেই এর নাম ব্যাম্বু চিকেন। এই চিকেন যারা একবারের জন্য হলেও পাহাড়ে গেছে তারাও খেয়েছে। দেশি মোরগের সাথে আদা, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, সাবারাং পাতা মিশিয়ে কাঁচা বাশের মধ্যে ঢুকিয়ে কলাপাতা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় বাশের মুখ। তারপর কয়লা দিয়ে রান্না করা হয় ব্যাম্বু চিকেন।

আরো পড়ুনঃ মজাদার খাবার ফুসকা খাচ্ছেন? জেনে নিন ফুসকার বিচিত্র নামের বাহার ও ইতিহাস

মুন্ডি

পাহাড়ীদের নিজস্ব পদ্ধতিতে বানানো হয় চালের তৈরী এই নুডলস। এই মুন্ডি মুরগি বা মাছের স্টকের সাথে খাওয়া হয়। মুন্ডি তৈরী করতে প্রথমে চাল ১৫ দিনের মতো ভিজিয়ে রাখতে হয়। এই ভেজানো চালকে ছোট ছিদ্র যুক্ত চালনীতে করে পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে শুকানো হয়। এরপর ঢেকিতে পিষে মন্ড তৈরী করা হয়। এই মুন্ডি বানাতে লাগে একটি বিশেষ যন্ত্র। তারপর এই মন্ডকে বিশেষ যন্ত্রটি দ্বারা চাপ দিলে নিচের দিকে চলে আসে নুডলস এর মতো চিকন লম্বা মুন্ডি। মশলা, শুটকি মাছ, ধনিয়া পাতা দিয়ে এই খাবার পরিবেশন করতে হয়।

আরো পড়ুনঃ পশ্চিমবঙ্গের কোলকাতার এবং বিভিন্ন জেলার লোভনীয় মিষ্টির কথা

হেবাং

চাকমাদের আরেকটি প্রিয় খাবার হলো শুটকি মাছ। আমাদের রান্নায় আমরা যেমন লবণ ব্যবহার করি ওরাও তেমনি রান্নায় শুটকি মাছ ব্যবহার করে। অনেক ধরনের শুটকি মাছ দিয়ে চুলায় ভাপে রান্না করা হয় হেবাং। হেবাং একটি রান্নার পদ্ধতি। শুটকি মাছ ছাড়াও মাংস দিয়েও হেবাং রান্না করা হয়। হেবাংকে এলাকাবাসী সুগনি হেবাং বলে।

আরো পড়ুনঃ ভোজ্য তেল হিসেবে সয়াবিন নাকি সরিষা কোনটা খাবেন? আর কেনই বা খাবেন?

নাপ্পি

কক্সবাজারের রাখাইন পল্লীতে নাপ্পির খুব প্রচলন। সমুদ্রের ছোট চিংড়িকে তারা মিম ইছা বলে। মিম ইছা রোদে শুকিয়ে লবণ ও বিভিন্ন মশলা দিয়ে নাপ্পি তৈরি করে। শুটকির মতো রান্না করে তারা আবার অন্যান্য খাবারের সাথেও দিয়ে রান্না করে, খাবারে তেল হিসাবে ব্যবহার করে।

আরো পড়ুনঃ চকলেট খাচ্ছেন? না কি খাচ্ছেন না? জানুন চকলেটের উপকারিতা ও অপকারিতা

শামুক ও ঝিনুক

পাহাড়িরা আমিষের চাহিদা মেটাতে শামুক ও ঝিনুক খেয়ে থাকে। তারা প্রায় সবদিনই এই খাবার খেয়ে থাকে। এই শামুক ঝিনুক বেশ মজা করেই রান্না করা হয়ে থাকে। বর্তমানে ঢাকার বিভিন্ন রেস্টুরেন্টেও এই খাবার পরিবেশন করা হয় এবং আমরা মজা করেই অনেক টাকা ব্যয় করেই খেয়ে থাকি।

পাহাড়ি কিছু ঐতিহ্যবাহী খাবার

বান্দরগুলা দিয়ে সবজি

বান্দরগুলা নাম শুনলেই কেমন জানি লেগে উঠে। কিন্তু এই বান্দুরগুলা একধরনের পাহাড়ি সবজি। প্রতি প্লেট ৩০-৩৫ টাকায় বিক্রি করা হয়।

আদাফুল দিয়ে ছোট মাছ

আদা আমরা সকলেই খেয়েছি। কিন্তু আমরা আদাফুল খায় না। পাহাড়িরা এই আদাফুল খুব বেশি খেয়ে থাকে। এই আদাফুল দিয়ে ছোট মাছ রান্না করলে খুব মজা হয়।

আরো পড়ুনঃ ভোজন রসিকদের জন্যে কলকাতার সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবারগুলো

কেবাং

হেবাং এর মতো কেবাং ও একটি রান্নার পদ্ধতি। বাশের ভিতরে মাংস ঢুকিয়ে আগুনে ঝলসিয়ে বা কলায় পুড়িয়ে রান্না করা হয়ে থাকে। পাহাড়িরা এতে শুকরের মাংসই বেশি ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু অন্য মাংস ব্যবহার করেও এই পদ্ধতিতে রান্না করা যায়। কেবাং পদ্ধতিতে মাছ বা মাংসের সাথে অন্যান্য সকল মশলা মিশিয়ে রান্না করা হয়।

কাকড়া ভুনা

সাংগুতে পাওয়া যায় অনেক কাকড়া। এসব কাকড়া খুব অল্প মশলা দিয়ে রান্না করা হয়। প্রতি প্লেট কাকড়া ভুনা ৩০-৩৫ টাকায় বিক্রি করা হয়।

আরো পড়ুনঃ হৃদরোগ নিয়ে চিন্তিত?

কাঠি কাবাব

মাছ বা মুরগির কাঠি কাবাব পাহাড়িরা সন্ধ্যার নাস্তায় খেয়ে থাকে। পাহাড়ি রেস্টুরেন্টে ৪০- ৪৫টাকায় পাওয়া যায় এই কাবাব।

তোজাহ

পাহাড়িরা খুব বেশি শাক ও সবজি খায়। তোজাহ তাদের একটি পছন্দের সবজি। নানা রকম পাহাড়ি সবজি দিয়ে এটি রান্না করা হয়। পাহাড়ে এক প্লেটের দাম ১৫-২০ টাকা।

এছাড়াও পাহাড়ের ফলের স্বাদ অনেক ভালো। যেমন পাহাড়ি কলা, আনারস, পেপে তো খুবই সুস্বাদু।

আরো পড়ুনঃ
বাঙ্গালির রন্ধন শৈলী বা রান্নাবান্নায় বাঙ্গালিয়ানা

Related Articles

Back to top button
error: Content is protected !!

Adblock Detected

Please turn off your Adblocker.