খাদ্য ও স্বাস্থ্যকথাস্বাস্থ্য টিপস

প্লাস্টিকের বোতল বারবার ব্যবহারে স্বাস্থ্য ঝুঁকি

প্লাস্টিকের বোতল বারবার ব্যবহারের ঝুকি

 প্লাস্টিকের বোতল বারবার ব্যবহারে ফলে যে স্বাস্থ্য ঝুঁকি আছে তা আমরা অনেকেই জানি না। তাই আমরা অনেক সময় কোক, ড্রিংকস বা পানি কিনে তার বোতল ফেলে না দিয়ে বারবার ব্যবহার করি। এই সব পরিত্যক্ত বোতলগুলো ফেলে না দিয়ে পানি, দুধ ইত্যাদি রাখতে বারবার ব্যবহার করি। এভাবে কতবার বা কতদিন পর্যন্ত এই পরিত্যক্ত বোতলগুলো বারবার ব্যবহার করা যায়?  এতে কি কোনো স্বাস্থ্য ঝুঁকি আছে?
আজ আমরা জানবো প্লাস্টিকের বোতল বারবার ব্যবহারে স্বাস্থ্য ঝুঁকি সম্পর্কে।

এখন ঘরে-বাইরে রাস্তা-ঘাটে দেদাছে ব্যবহৃত হচ্ছে প্লাস্টিকের বোতল। এক বোতল পানি কিনে খেলেন তো বোতলটার যথা যথ রিসাইকেল হলো না। তাই বোতলটা হয়ে গেল পুনরায় পানি খাওয়ার পাত্র। যত দিন এই বোতল ব্যবহার করা যায় আর কি। আপনার শিশু সন্তানদের স্কুলে পানি দেবেন? সেখানও দেখা যায় যে প্লাস্টিকের বোতল বা অন্য কোন কনটেইনার  ব্যবহার হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কি স্বাস্থ্যসম্মত বা শরীরের জন্য নিরাপদ?

সাধারণত দুই ধরনের প্লাস্টিক দিয়ে এসব  বহুল প্রচলিত মিনারেল ওয়াটার বা ড্রিংকিস এর বোতল তৈরি করা হয়। এর একটি হলো পলিকার্বন, এটা বিসফেনল থেকে উৎপাদান করা হয় এবং অন্যটি পলিইথিলিন টেরেফথালেট বা পলিইথিলিন থেকে উৎপাদান করা হয়।

পলিইথিলিনকে নিরাপদ বিবেচনা করা হলেও বিসফেনল হয়ক্ষতিকর। কারণ পলিইথিলিন প্লাস্টিকের আধারে জমে থাকা উৎপাদান দ্রবীভূত করার ক্ষমতা রাখে।

বিসফেনল নানা স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির কারণ যেমন— অনুর্বরতা, মোটা হয়ে যাওয়া, ডায়াবেটিস, গলার ক্যান্সার। এমনকি এ উপাদান আমাদের কেন্দ্রীয় সংবেদনশীলতাকেও অবশ করে দিতে পারে। স্তন ও জরায়ু ক্যান্সারের কারণও হয়ে উঠতে পারে এ বিসফেনল। ১৯৫০ সাল থেকেই বাণিজ্যিকভাবে প্লাস্টিকে বিসফেনল এর ব্যবহার হয়ে আসছে; যার ক্ষতিকর বিষয়গুলো এরই মধ্যে প্রমাণিত।

ফুডগ্রেড হোক কিংবা নন ফুডগ্রেড হোক বোতলজাত প্লাস্টিক কখনোই পুরনায় ব্যবহার করা উচিত। কারণ বোতলজাত প্লাস্টিক শুধুমাত্র একবার ব্যবহারের জন্যই তৈরি করা হয়ে। তাই অনেক দেশের বোতলের গায়ে লিখা থাকে “Do Not Reuse”

এ প্রশ্নর উত্তর খুঁজতে গেলে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের মানের বিষয়টি প্রথমে এসে যায়। কোন ধরনের প্লাস্টিক স্বাস্থ্যসম্মত?

বর্ত্মান নগরভিত্তিক সমাজে বলা চলে প্লাস্টিকের তৈরি উপাদান ছাড়া জীবন চালানো একটু কঠিনই। গৃহিস্থলির কাজে প্লাস্টিক সামগ্রী যে কত ব্যবহার করা হচ্ছে, এর কোনো ইয়ত্তা নেই।

আপনি জানেন কি, এই প্লাস্টিকের বোতল বা পাত্রের তলায়ই আছে উক্ত প্লাস্টিক পণ্যের বিষয়ে সতর্কবার্তা? না দেখে থাকলে আপনার নাগালে থাকা প্লাস্টিক পণ্যের নিচে একবার চোখ বুলিয়ে নিন।

সেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অনুসারে তিনকোনা রিসাইক্লিং প্রতিকের মাধ্যমে দেওয়া আছে সতর্ক নম্বর যুক্ত বার্তা। কোন প্লাস্টিকের বোতল বা প্লাস্টিকের পাত্র কতবার ব্যবহার করা যাবে অথবা ব্যবহার করা কতটা নিরাপদ হবে—এই সতর্ক নম্বর যুক্ত বার্তা তারই আভাস দিচ্ছে।

প্রথমে এই কোড যুক্তরাষ্ট্রের মাননিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান এএসটিএম ইন্টারন্যাশনাল প্রচলন করে। এটা এখন সারা বিশ্বে প্রচলিত। আমাদের দেশের প্লাস্টিকে সামগ্রীর বেলায়ও সতর্ক নম্বর যুক্ত বার্তা দেখা যায়।

উক্ত নম্বর ১ থেকে ৭ পর্যন্ত হয়ে থাকে। পাশেই থাকে সাংকেতিক কোড।  এই কোডের মধ্যে ২, ৪ ও ৫—এই তিনটি নম্বরযুক্ত প্লাস্টিক ব্যবহার করা বেশী নিরাপদ। আর ১ ও ৭ নম্বরযুক্ত প্লাস্টিকে স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম থাকে। আবার ৩ ও ৬ নম্বরযুক্ত প্লাস্টিক স্বাস্থ্যের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।

এখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে তিনকোনা রিসাইক্লিং চিহ্নের মধ্যে দেওয়া আছে সতর্ক নম্বর।

সতর্কতা নম্বর ১:
এএসটিএম ইন্টারন্যাশনালের মতে, এই শ্রেণির প্লাস্টিককে পলিথিলিন প্যারেসথালেট বলে। এর সাংকেতিক কোড পিইটি বা পিইটিই। এই ধরনের প্লাস্টিক সাধারণত প্রসাধনসামগ্রীর বাক্স, বাসায় ব্যবহারযোগ্য জিনিস, পানি বা জুসের বোতল তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। কোমল পানীয় বা তেল রাখার জন্যও এ জাতীয় প্লাস্টিকের ব্যবহার হয়। এ ধরনের প্লাস্টিকের বোতল বা পাত্র বেশি দিন ব্যবহার করা উচিত নয়। এই প্লাস্টিক দীর্ঘ সময় গরম স্থানে রাখলে এক ধরনের পদার্থ নির্গত করে যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তাই এই নম্বরযুক্ত প্লাস্টিক একাধিকবার ব্যবহার করা স্বাস্থ্যের ক্ষতিকর।

সতর্কতা নম্বর ২:
এ ধরনের প্লাস্টিক উচ্চ ঘনত্বের পলিথিলিন, এর সাংকেতিক কোড এইচডিপিই। এই প্লাস্টিক শক্ত ও স্বচ্ছ হয়; এটা কিছুটা উচ্চ তাপমাত্রায় রাখা যায়। এ নম্বরযুক্ত প্লাস্টিকের সামগ্রী সবচেয়ে বেশী নিরাপদ। সাধারণত বাচ্চাদের খেলনা ও খাবার প্যাকেজিংয়ে এ ধরনের প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয় দুধ রাখার যে পাত্রগুলো বাজারে পাওয়া যায়, তা-ও এই প্লাস্টিক দিয়েই তৈরি করা হয়। এই নম্বরযুক্ত প্লাস্টিকের জিনিস একাধিকবার ব্যবহার করা যায়।

সতর্কতা নম্বর ৩:
এটাকে পলিভিনাইল ক্লোরাইড প্লাস্টিক বলে, এর সাংকেতিক কোড পিভিসি। নিত্য ব্যবহারের জন্য এই নম্বরযুক্ত প্লাস্টিকের বোতল বা পাত্র খুবই বেশী বিপজ্জনক। সাধারণত, এ ধরনের প্লাস্টিক দিয়ে গোসলখানা বা বাথরুমের জিনিস , পুলে ব্যবহারের জন্য উপাদান, বিভিন্ন ইনফ্লাটেবল উপাদান ও পোশাক তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয়।

এই নম্বরযুক্ত প্লাস্টিক ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা উচিত।

সতর্কতা নম্বর ৪:
এ ধরনের প্লাস্টিক কম ঘনত্বের পলিথিলিন, এর সাংকেতিক কোড এলডিপিই। এ ধরনের প্লাস্টিক স্বচ্ছ এবং এটি বাঁকানো যায়। এটি জুস ও দুধের পাত্রে বেশি ব্যবহার করা হয়। বেশির ভাগ বাজারের ব্যাগ এই প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি। এই নম্বরযুক্ত প্লাস্টিক বেশ নিরাপদ।

সতর্কতা নম্বর ৫:
এই শ্রেণির প্লাস্টিককে পলিপ্রোপাইলিন বলে, এর সাংকেতিক কোড পিপি। এই প্লাস্টিক দিয়ে বাচ্চাদের বোতল, কাপ ইত্যাদি তৈরি করা হয়ে থাকে।এই নম্বরযুক্ত প্লাস্টিক রান্নাঘরের জিনিস ও মাইক্রোওয়েভে ব্যবহার করা হয়। এই নম্বরযুক্ত প্লাস্টিকের জিনিস একাধিকবার ব্যবহার করা যায়।

তবে রান্নাঘরে গরম পাত্র রাখার জন্য প্লাস্টিক এর জিনিস থেকে কাচের জিনিস উত্তম। আর মাইক্রোওয়েভ কিনলে অভ্যন্তরে কাচের দেয়াল দেখে কেনা ভালো।

সতর্কতা নম্বর ৬:
এটাকে পলিস্টাইরিন প্লাস্টিক বলে, এর সাংকেতিক কোড পিএস। এটি পেট্রোলিয়াম থেকে তৈরি করা হয়। এটা শক্ত বা নরম উভয় ধরনের হতে পারে। এই নম্বরযুক্ত প্লাস্টিক খুবই ক্ষতিকর। এই প্লাস্টিক সিডি, ডিভিডি বা ডিম বহনের বক্স তৈরিতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। হোটেল থেকে আমরা যে ফোমের পাত্রে খাবার এনে থাকি, তা-ও এ ধরনের প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি করা হয়। এই নম্বরযুক্ত প্লাস্টিকের জিনিস অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

সতর্কতা নম্বর ৭:
এই প্লাস্টিককে পলিকার্বোনেট বলে, যার সাংকেতিক কোড পিসি। এটি মোটামুটি নিরাপদ। বৈদ্যুতিক তার, সিডি ও ডিভিডি এই প্লাস্টিক থেকে তৈরি করা হয়। একাধিকবার এই নম্বরযুক্ত প্লাস্টিকের জিনিস ব্যবহার করা যায়। বাচ্চাদের বোতল ও অন্যান্য পানির বোতল এ ধরনের প্লাস্টিক থেকে তৈরি করা হয়ে থাকে।

অতএব, পানির বা ড্রিংকসের বোতল কখনোই পুনরায় ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ এগুলো বানানো হয় শুধুমাত্র ওয়ান টাইম ইউজের জন্য।

যেসব প্লস্টিক ফুড গ্রেড সেসব বোতলের মেয়াদ থাকে সাধারণত দুই থেকে তিন মাস। এই মেয়াদ হয়তো ফ্যাক্টরি থেকে দোকানে আসতে বা দোকানদারের ফ্রিজে থাকতে থাকতেই মেয়াদউত্তীর্ণ হয়ে যেতে পারে। 

ফলে প্ল্যাস্টিকের বোতল মোটেও পুররায় ব্যবহার করা উচিত নয়।

আরো পড়ুনঃ

পানি পান করার সঠিক নিয়ম

মস্তিষ্কের জন্য সেরা খাবার

সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য যে কাজগুলো করা দরকার

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
error: Content is protected !!

Adblock Detected

Please turn off your Adblocker.