খাদ্য ও খাদ্যাভ্যাস

মজাদার খাবার ফুসকা খাচ্ছেন? জেনে নিন ফুসকার বিচিত্র নামের বাহার ও ইতিহাস

ফুসকার বিচিত্র নাম ও ইতিহাস

মজাদার খাবার ফুসকা
মজাদার খাবার ফুসকা

মজাদার খাবার ফুসকা নামটি মনে আসলেই আমাদের সবার মুখ জলে ভরে আসে। আর ফুসকা এমন একটি খাবার যার কথা মনে পড়লেই সবথেকে প্রথমে আমাদের মনে আসে সেই তেতুল জলে ভরা আলু, পিয়াজ দিয়ে বানানো একতি গোলাকার বস্তু যা কিনা মুখে দিলেই মুখ টক জলে ভরে আসে। এই মজাদার খাবার ফুসকা সাধারণত আটা এবং সুজি দ্বারা তৈরি করা একটি গোলাকার ফাঁপা বলের ভেতরে আলু, মটরের পুর ভরে সেই বলকে টকঝাল তেঁতুল জল দিয়ে খেতে হয়। ফুসকা খেতে এক অমৃত স্বাদ।বুড়ো থেকে শুরু করে পিচ্চিরাও ফুসকা খেতে ভালোবাসে।  শুধু ভারত বা বাংলাদেশ নয় পুরো উপমহাদেশেরই একটি বিখ্যাত জনপ্রিয় স্ন্যাকস এই ফুচকা। সম্প্রতি এক গবেষণায় ফুচকার ব্যাপারে মজাদার এক তথ্য উঠে এসেছে। বলা হচ্ছে, ফুচকার টেস্ট খুব দ্রুত মুখের টেস্ট বাডগুলোতে সঞ্চারিত হয়। তাতে মনখারাপও সহজেই ঠিক হয়ে যায়। আসলেই ফুসকা খেলেই আমাদের মন মূহূর্তেই চাঙ্গা হয়ে ওঠে। আমরা আমাদের সব কষ্ট মন থেকে ভুলে যায়। ফুসকা মুখে পুড়লেই মন ভরে উঠে আনন্দে।

মজাদার খাবার ফুসকার নামের বাহারঃ

১। গোল গাপ্পা

ভারতের উত্তরে হরিয়ানা রাজ্যে এই মজাদার খাবার ফুসকা  ‘গোল গাপ্পা’ নামে পরিচিত। হরিয়ানার বিভিন্ন শহরে এর জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া। শহরের প্রতিটি ফুটপাত দিয়ে হেঁটে চললেই চোখে পরে গোল গাপ্পের বাহারি নানা স্টল। এই গোল গাপ্পে কিন্তু মোটেই গোলাকার নয়, বরঞ্চ একটু লম্বাটে ধরনের। এতে দেয়া হয় আলু, মটর আর সাথে মিষ্টি চাটনি, আবার কোথাও এই মিষ্টি চাটনি টক জলে মিশে মাখামাখি হয়ে থাকে। এই টক-মিষ্টি পানিতে থাকে বিশেষ ধরনের মশলা এবং হালকা পুদিনাপাতার সমাহার।

২। পকোড়ি, গুজরাট

ভারতের গুজরাট রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ফুচকাকে পকোড়ি নামে পরিচিত। পকোড়ি অনেকটা ফুচকার মতোই পরিবশেন করা হয় এবং স্বাদেও প্রায় একই রকম। তবে খাবারে সামান্য বৈচিত্র্য স্বাদ আনতে পকোড়িতে দেওয়া হয় ঝুরি ভাজা। আবার অনেকে এর মধ্যে পেঁয়াজকুচিও দিয়ে থাকেন। তবে এখানে পকোড়ির সাথে মিষ্টি চাটনি দেয়ার পরিবর্তে পুদিনা পাতা ও কাঁচা মরিচের কুচি তেঁতুলের টক-ঝাল পানিতে মিশিয়ে পরিবেশন করা হয়।

৩। ফুলকি, উত্তর প্রদেশ

গুজরাটসহ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় রুটিকে অনেকে চাপাতি বা ফুলকা বলে থাকলেও মূলত উত্তর প্রদেশের অনেক স্থানেই ফুচকাকে ফুলকি হিসেবে ডাকা হয়ে থাকে। আর রমজান মাসে উত্তর প্রদেশের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বিশেষভাবে তৈরি ‘দহি ফুলকি’ তৈরি করা হয়ে থাকে, যা খেতে ক্রেতাদের বিশাল লাইন পড়ে যায়। মটরের তৈরি দই বড়া দিয়ে বানানো হয় এই বিশেষ দহি ফুলকি।

৪। পানি পুরি, মহারাষ্ট্র

ভারতে ফুচকার সবচেয়ে পরিচিত নাম পানি পুরি। মহারাষ্ট্রে এটি বিশেষ ভাবে জনপ্রিয়। তবে শুধু মহারাষ্ট্রেই নয়, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক, এমনকি ভারতের অনেক অঞ্চলে পানি পুরির জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বি। তবে বিভিন্ন অঞ্চলে এর নাম একই হলেও রন্ধন উপকরণ, পরিবেশন ও স্বাদে বেশ পার্থক্য দেখা যায়।

ভারতে ফুচকার সবচেয়ে পরিচিত নাম পানি পুরি। মহারাষ্ট্রে এটি বিশেষ ভাবে জনপ্রিয়। তবে শুধু মহারাষ্ট্রেই নয়, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক, এমনকি ভারতের অনেক অঞ্চলে পানি পুরির জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বি। তবে বিভিন্ন অঞ্চলে এর নাম একই হলেও রন্ধন উপকরণ, পরিবেশন ও স্বাদে বেশ পার্থক্য দেখা যায়।

৫। ফুচকা, বাংলা ও আসাম

বাংলাদেশের মতোই ভারতের আসাম এবং বাংলার মানুষের এই মজাদার খাবার ফুসকা খুব পছন্দের।

ভারতের পশ্চিম বাংলা ও আসামে বাংলাদেশের মতোই ‘ফুচকা’ নামটিই এখানকার পরিচিত। এছাড়া বিহার, ঝাড়খণ্ডেও এই ফুচকা বেশ পরিচিত ও জনপ্রিয়। এসব অঞ্চলের ফুচকা তৈরির উপকরণ, পরিবেশন আর স্বাদ পানি পুরির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানাকার ফুচকায় আলু মাখা ও সেদ্ধ ছোলারে মিশ্রণ দেয়া হয় এবং তা বেশ ঝাল করে তৈরি করা হয়। আর সেই ফুচকা মিষ্টি চাটনিতে নয়, তেঁতুলের টক জলে ডুবিয়ে পরিবেশন করা হয়। এই ফুচকা পানি পুরির থেকে আকারে কিছুটা বড় হয়ে থাকে। আর কড়া করে ভাজার কারণে রঙও বেশ লালচে হয়।

৬। টিক্কি, হায়দ্রাবাদ

হায়দ্রাবাদের ফুচকার এক বিশেষ নাম ‘টিক্কি; হায়দ্রাবাদ এবং মধ্য প্রদেশের বেশ কিছু অঞ্চলে ফুচকার আরেক নাম ‘টিক্কি’। এই টিক্কি তৈরির উপকরণ, পরিবেশন ও স্বাদ অনেকটা পানি পুরির মতোই। এখানে টিক্কিতে সেদ্ধ মটর ও আলুর মিশ্রণ দেয়া হয়, আর তা তেঁতুলের টক জলে ডোবানো থাকে। তবে ক্রেতার চাহিদামতো টক আর ঝালের তারতম্য করা হয়। 

৭। দহি পুরি, দিল্লি

দিল্লিতে ফুচকার এক জনপ্রিয় নাম দহি পুরি। দিল্লি ছাড়া মুম্বাইয়ের কিছু অঞ্চলেও  এই দহি পুরি বেশ জনপ্রিয়। গোল গাপ্পের মতো এখানে পুরিতে সিদ্ধ আলু ও মটরের ঝাল মিশ্রণ তৈরি করা হয়। গোল গাপ্পে যেমন টক-মিষ্টি চাটনি সমেত পরিবেশন করা হয়, এখানে তার পরিবর্তে দইয়ের তৈরি মিষ্টি চাটনি সহযোগে এই পুরি পরিবেশন করা হয়।

৮।সেভপুরি, মধ্য প্রদেশ

মধ্য প্রদেশসহ মুম্বাই, পুনের আকর্ষণীয় এক পদ সেভপুরি।  সেভ বা ভুজিয়া, বাংলাদেশে যা শুধু চিকন চানাচুর ভাজা হিসেবে পরিচিত। এই সেভ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ পরিচিত এক জলখাবার। আর মধ্য প্রদেশসহ মুম্বাই, পুনের অনেক স্থানেই এই সেভ সহযোগে তৈরি ফুচকা সেভপুরি হিসেবে পরিচিত। মূলত মুম্বাইয়ে এটির উৎপত্তি হলেও আজ অনেক জায়গায় এই সেভপুরি এক জনপ্রিয় খাবার হিসেবে তার জায়গা করে নিয়েছে।

এই সেভপুরিতে পেঁয়াজ কুচি আর আলুর সাথে নানা মশলা সহযোগে এক মিশ্রণ তৈরি করা হয়। এর সাথে কাঁচা মরিচের কুচি, মিহি করে কাটা রসুন তেতুঁলের জলে মিশিয়ে তার ওপর ছড়িয়ে দেয়া হয় সেভ। এই চাটনির সাথে সেভপুরি পরিবেশন করা হয়।

৯।গুপ চুপ, উড়িষ্যা

উড়িষ্যায় ফুচকা ‘গুপ চুপ’ নামে অধিক পরিচিত। উড়িষ্যা ছাড়াও দক্ষিণ, ছত্তিসগড়, তেলেঙ্গানা এবং হায়দ্রাবাদের বেশ কিছু অঞ্চলে ফুচকাকে এই মজার নামে ডাকা হয়ে থাকে। তবে ফুচকার মতো এখানে আলু ব্যবহার করা হয় না, তার পরিবর্তে গুপ চুপে থাকে ছোলা বা মটর সেদ্ধ আর র মাঝে শোভা পায় পেঁয়াজ কুচি। তবে এই পেঁয়াজ কুচি সাধারণত ক্রেতার অনুরোধে পরিবেশন করা হয়। তেঁতুলের টক-ঝাল-মিষ্টি পানি সহযোগে গুপ চুপ পরিবেশিত হয়। 

১০।পাতাশি বা পানি কে বাতাশে, রাজস্থান

রাজস্থানের বিভিন্ন জায়গার জনপ্রিয় এক খাবার পানি কে বাতাশে।

রাজস্থানের বিভিন্ন জায়গায় পাতাশি স্বাদ অনেকটা গোল গাপ্পের মতোই। তবে পাতাশিতে আলু এবং মটরের মিশ্রণ দেয়া হয় এবং পাতাশির জলে তেঁতুলের পরিবর্তে শুকনো আম ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তবে হরিয়ানার কিছু কিছু স্থানে আবার এই ফুচকাকে ‘পানি কে পাতাশি’, আবার উত্তর প্রদেশের বেশ কিছু স্থানে একে ‘পানি কে বাতাশে’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। আলু, ছোলা, মটরের মিশ্রণ ভরা পানি কে বাতাশে ডোবানো হয় বেশ মশলাদার জলে। লক্ষ্ণৌতে আবার পানি কে বাতাশে পাঁচটি আলাদা স্বাদের জলে ডোবানো হয়, যাকে ‘পাঁচ সোয়াদ কে বাতাশে’ বলে ডাকা হয়। লক্ষ্ণৌর হজরতগঞ্জে এই বাতাশে বেশ বিখ্যাত।

ফুসকাকে  বাতাসে, ফুচকা, গুপচুপ, বাতাসি, পাকাডা, পানিপুরি, পাকোরি- যে নামেই ডাকুন এই খাবার বাঙালির প্রাণের। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই ধরেছেন, আমি জিভে জল আনা খাবার ফুচকার কথা বলছি। যদি জানতে চান যে ওইরকম নামকরণের কারণ কী? তাহলে কয়েকটি জেনে নিন-

রসনাগত ভিন্নতাঃ নামকরণের ভিন্নতার পাশাপাশি অঞ্চলভেদে এর পরিবেশনের পদ্ধতিতেও ভিন্নতা লক্ষ্য করা গেছে। তবে মূল পার্থক্য থাকে এর পুর তৈরির উপকরণে। নানা জায়গায় আলুর পুর, সবজির পুর, সালাডের পুর, ঘুঘনির পুর কিংবা শুধু টকমিষ্টি জল ব্যবহার করা হয়। কোনও কোনও এলাকায় ঝালের পরিবর্তে মিষ্টিজাতীয় পুর ব্যবহার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে সব ঠিক থাকলেও তেঁতুল জল না দিয়ে ধনে পাতার চাটনি, পুদিনা মেশানো জল, লেবু জল কিংবা মিষ্টি খেজুর জল দেওয়া হয়। আবার দই-ফুচকা বা টক দইসহযোগে পরিবেশিত ফুচকাও বেশ জনপ্রিয়। এতে পুরের মধ্যে নানা ছোলা, চানাচুর, মিষ্টি পাপড়ের সঙ্গে দেওয়া হয় বাদাম কুচি। তেঁতুল জলের বদলে থাকে টক-মিষ্টি দই।

উৎস

মনে করা হয়, পানিপুরি বা ফুচকা বা ফুলকির উদ্ভব হয়েছিল দক্ষিণ বিহারের মগধে। তবে এই নিয়ে বিতর্ক আছে। আছে কিংবদন্তিও।

কিংবদন্তি– ফুচকা নিয়ে চালু কিংবদন্তিটি এবারে জেনে নেওয়া যাক। মহাভারতের সময়কাল। দ্রৌপদীর তখন সদ্য বিয়ে হয়েছে। একদিন শাশুড়ি কুন্তী যাচাই করতে চাইলেন যে অল্প কিছু উপকরণ দিয়ে তাঁর পুত্রবধূ দ্রৌপদী কতটা ভাল খাবার বানাতে পারে। তাই তিনি একটু আলুর সবজি ও ময়দামাখা দিয়ে তাঁকে কিছু একটা বানাতে বলেন। সে সময় দ্রৌপদী আবিষ্কার ফুচকা আবিষ্কার করেন। কুন্তী সেই ফুচকা খেয়ে এতটাই মোহিত হয়েছিলেন যে, সেই খাবারকে অমরত্ব প্রাপ্তির আশীর্বাদ করে.।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক জার্নাল অব ইন্ডিয়ায় ফুচকার বিশদ বিবরণ জানাতে গিয়ে এর উৎপত্তিস্থল হিসেবে বারাণসীর কথা বলা হয়েছে। সে যাই হোক, বহু পুরনো এই খাবারকে শক্ত কুড়মুড়ে করে খাওয়ার প্রচলন শুরু হয় অনেক পরে। মোগলাই খানার সংস্পর্শে এসে এর গঠনগত আঙ্গিকের পরিবর্তন হয় বলেও মনে করা হয়।

সবশেষে বলতে গেলে এই ফুসকা কিন্তু বাংলাতে সেই বহু আগের থেকেই। প্রাচীন মানুষেরাও ফুসকা খেতে এবং এখনো সেই একইভাবে ফুসকার প্রচলন রয়েছে। ফুসকা তার জনপ্রিয়তা হারায়নি।

আরো পড়ুনঃ

Related Articles

Back to top button
error: Content is protected !!

Adblock Detected

Please turn off your Adblocker.