খাদ্য ও খাদ্যাভ্যাস

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি

বাংলাদেশে মিষ্টির ঐতিহ্য বহুদিনের। আমাদের দেশের মিষ্টির কারিগরেরা অতি যত্ন সহকারে মিষ্টি তৈরি করে বলে তার স্বাদ দেশ ছেড়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। আজ আমরা জানবো মিষ্টি আসলে কি? কিভাবে তৈরী হয় এইসব সুস্বাদু মিষ্টি? বাংলায় এসব মিষ্টি কখন থেকে প্রচলন শুরু হলো?

মিষ্টি হলো চিনি বা গুড়ের রসে ভেজানো ময়দার গোলা বা দুধ-চিনি মিশিয়ে তৈরী বিভিন্ন আকৃতির ছানা বা ময়দা টুকরা করে বানানোসুস্বাদু খাবার।

বাঙালিদের যেকোন শুভ অনুষ্ঠানে মিষ্টিমুখ না করলে যেন চলেই না। যেকোন সুসংবাদ পাওয়ার সাথে সাথেই বাঙ্গালিরা মিষ্টি নিয়ে হাজির। আবার যেকোন পালা-পার্বণে বাঙালির মিষ্টি ছাড়া যেন চলেই না। কারো বাড়িতে বেরাতে গেলে কোন না কোন একপ্রকার মিষ্টি নিতে বাঙালি যেন ভুলেই না।

আসুন এখন আমরা জেনে নিই কখন বাংলায় প্রবেশ করলো কোন মিষ্টি।

ভারতবর্ষের অতি প্রাচীন মিষ্টি মতিচুরের লাড্ডু। প্রায় দুই হাজার বছরেরও আগে এই লাড্ডু বানানো শুরু হয়। আধুনিক সন্দেশ রসগোল্লার জন্ম মাত্র দুই বা আড়াইশ বছর পুর্ব থেকে। মূলত বাঙ্গালিরা ছানা তৈরী করতে শিখেছে পর্তুগিজদের থেকে। তাদের থেকেই বাঙালি ছানা ও পনিরের কৌশল শিখে রাখে।

মূলত ছানা আবিষ্কারের আগেও সন্দেশ বানানো হতো। সেগুলো বেসন, নারকেল, চিনি, মুগের ডালের সহযোগে বানানো হতো। শাস্ত্রসম্মত কারণে অনেকেই ছানার সন্দেশ খেতে চাইতেন না। বাংলার ময়রাদের সৃষ্টিতে মুগ্ধ হয়ে শংকর তার বাঙালির খাওয়া দাওয়া বইতে কড়াপাক, নরমপাক , কাচাগোল্লা সন্দেশসহ আরো অনেক সন্দেশের কথা উল্লেখ করেছেন।

রসগোল্লার নাম আগে ছিল গোপাল গোল্লা। পরে বাঙালি চিনির সিরায় ডোবানো বিশুদ্ধ ছানার গোল্লাকে নাম দেয় রসগোল্লা।

এখন আমরা বিভিন্ন জেলার পাঁচটি ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির সাথে পরিচিত হবো।

আরো পড়ুনঃ

বাংলাদেশের আঞ্চলিক খাবার

পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী খাবার

পানি পান করার সঠিক নিয়ম

১। টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম

টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম

টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচমকে বলা হয় মিষ্টির রাজা। এই মিষ্টি স্বাদে, গন্ধে অতুলনীয়। লালচে রঙয়ের এই মিষ্টির ভিতরের অংশ রসালো নরম, উপরের অংশে থাকে চিনির আবরণ, ভিতরটা থাকে কিছুটা ফাপা। যমুনা নদীর শাখা নদী ধলেশ্বরী নদীর পাড়ের গ্রাম পোড়াবাড়ি যেখানে প্রথম শুরু করা হয় এই চমচম মিষ্টি।

এই চমচমের স্বাদ মূলত পানি, খাটি দুধ ও কারিগড়ের হাতের কৌশলের উপরই নির্ভর করে। ধলেশ্বরী নদীর পানি এই মিষ্টির স্বাদে যেন অন্যরকম একটা স্বাদ যোগ করতো।

প্রায় দেড়শ বছর আগে ভারতের রাজা রাম গোরার হাতে জন্ম নেয় এই সুস্বাদু মিষ্টি। প্রথমে দুধ থেকে ছানা তৈরী করা হয়। তারপর সেই ছানাকে দেওয়া হয় মিষ্টির আকৃতি। কিছু সময় পর গোল করা মিষ্টিগুলোকে চিনির সিরায় দিয়ে ফুটানো হয় প্রায় ৪৫ মিনিট। ঠান্ডা হয়ে গেলে মিষ্টিগুলোকে ক্ষীরের মাঝে দিয়ে পুরু করা হয়।

পোড়াবাড়ির এই খাটি চমচম পাওয়া যায় কালিবাড়ি বাজারের মিষ্টির দোকান গুলোতে। খোকা ঘোষের জয়কালী মিষ্টান্ন ভান্ডার, গোপাল মিষ্টান্ন ভান্ডারে।

আরো পড়ুনঃ

মালাই চমচম রেসিপি

মস্তিষ্কের জন্য সেরা খাবার

২। কুমিল্লার রসমালাই

কুমিল্লার রসমালাই

ধারণা করা হয় উনিশ শতকে এই রসমালাই প্রথম চালু করা হয়। শুধু দেশেই নয় ভৌগলিক নির্দেশক হিসাবে আন্তর্জাতিকভাবেও এর ব্যাপক সুনাম রয়েছে। কুমিল্লা শহরের মাতৃভান্ডারের রসমালাই সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত।

১৯৩০ সালে এই মাতৃভান্ডারের রসমালাই যাত্রা শুরু করে। সংকর সেনগুপ্ত এটির যাত্রা শুরু করেন। বর্তমানে অর্ণিবাণ সেনগুপ্ত এটা পরিচালনা করেন। দেশের বিভিন্ন বড় বড় অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় অতিথিদের এই মাতৃভান্ডারের রসমালাই দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়।

তবে একটি দুঃখের খবর ও আছে এই কুমিল্লার রসমালাইয়ের এতোই খ্যাতি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে যে কুমিল্লার শহরের বিভিন্ন জায়গায় একই নাম দিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা ভিন্ন ধরনের রসমালাই বিক্রি করছে। তাই আসল রসমালাই খুজে পাওয়া কষ্টকর। তবে কুমিল্লার মনোহরপুরের মাতৃভান্ডার মিষ্টান্ন দোকানে আসল রসমালাই পাওয়া যায়।

কুমিল্লা শহরের এই রসমালাইয়ের দোকানের পাশাপাশি রয়েছে প্যারা ভান্ডার, শীতল ভান্ডার, পোড়াবাড়ি, জেনিস, জলযোগ, কুমিল্লা মিষ্টি ভান্ডার ইত্যাদি। এসব জায়গার রসমালাই মাতৃভান্ডারের মতো না হলেও অনেকটাই ভালো মানের।

আরো পড়ুনঃ
মজাদার খাবার ফুসকা খাচ্ছেন? জেনে নিন ফুসকার বিচিত্র নামের বাহার ও ইতিহাস

ভোজন রসিক বাঙ্গালি ও তার রসনা বিলাসের চিরাচরিত অভ্যাসের

৩। নওগাঁর প্যারা সন্দেশ

নওগার প্যারা সন্দেশ

নওগাঁর প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি হচ্ছে প্যারা সন্দেশ। দুধের ক্ষীর দিয়ে তৈরি করা হয় এই প্যারা সন্দেশ। বহুকাল আগে থেকে নওগাঁ জেলার কালিতলায় মহেন্দ্রী দাস নামে এক ব্যক্তি প্রথম এই প্যারা সন্দেশ তৈরী করা শুরু করেন। বর্তমানে দেশের অন্যান্য জেলায় ও এই প্যারা সন্দেশ তৈরী করা হয়।

প্রথম দিকে শুধুমাত্র মন্দিরে দেব-দেবীর পূজার সময় এই প্যারা সন্দেশ দেওয়া হতো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এটা শুধু দেব দেবীর পূজাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বর্তমানে এই মিষ্টি দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও বেশ সুনাম অর্জন করেছে।

প্যারা সন্দেশ তৈরী করার সময় তরল দুধের সাথে চিনি ভালো করে মিশিয়ে জ্বাল করা হয়। ক্ষীর তৈরী করে নেওয়া হয়। ক্ষীর যখন ভালো মতো জড়িয়ে আসে তখন হাতের সাথে ভালো করে চ্যাপটা করে বানিয়ে নেওয়া হয় এই প্যারা সন্দেশ।

এই সন্দেশ হালকা খয়েরী রঙয়ের হয়ে থাকে। প্রতি সন্দেশ প্রায় আধা ইঞ্চি চওড়া ও দুই ইঞ্চি লম্বা হয়ে থাকে। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় এই সন্দেশ ১০-১৫ দিন ভালো থাকে। ফ্রিজে রাখলে আরো অনেক দিন সংরক্ষন করা যায়।

আরো পড়ুনঃ

জেনে নিন বিভিন্ন জাতের আম চেনার উপায়

ডায়াবেটিস রোগী কি লিচু খেতে পারবে

৪। নাটোরের কাচাগোল্লা

নাটোরের কাচাগোল্লা

কাচাগোল্লা বাংলাদেশের নাটোর জেলায় প্রথম উৎপন্ন হয়। এটি গরুর দুধ দিয়ে তৈরী করা একটি মিষ্ঠান্ন। এই মিষ্টি খাটি গরুর দুধ থেকে প্রাপ্ত কাঁচা ছানা দিয়ে তৈরী করা হয়। তাই এই মিষ্টির নাম কাচাগোল্লা।

নাটরের এই কাচাগোল্লা নাটোর জেলা থেকেই প্রথম শুরু হয়। পরে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় এই মিষ্টির খুব বেশি প্রচলন রয়েছে। বর্তমানে এই মিষ্টির খ্যাতি বহুদূর ছড়িয়ে পড়েছে। সুদূর পশ্চিমবঙ্গেও এখন এই মিষ্টি পাওয়া যায়।

কাঁচা গোল্লার সৃষ্টি নিয়ে রয়েছে বিভিন্ন জনশ্রুতি। নাটোর শহরের লালবাজারের মধুসূদন পালের দোকান নাটোর জেলার অন্যতম প্রসিদ্ধ একটা দোকান ছিল। তারা দোকানের বেশ বড় বড় চুলায় পানতোয়া, চমচম, কালোজাম প্রভৃতি মিষ্টি তৈরী করতেন।

একদিন হঠাত মধুসূদন পালের দোকানে কর্মচারী কম এসেছে। তিনি চিন্তায় পড়ে গেছেন এখন তিনি এতো ছানা দিয়ে কি করবেন? নষ্ট থেকে বাচাতে তিনি চিনির সিরায় জ্বাল করে নতুন একটি মিষ্টি বানিয়ে নিলেন।

কাঁচা ছানাকে চিনির রসে জ্বাল দিয়ে নিতে হয়। তারপর ছানা আঠালো হয়ে এলে এতে ক্রিম ও এলাচ গুড়া যোগ করে বানিয়ে নেওয়া হয় কাচাগোল্লা যা অন্যসব মিষ্টিকে হার মানাবে।

নাটোর শহরের সব দোকানেই এই মিষ্টি ভালো পাওয়া যায় না। লালবাজারের মধুসূদন পালের দোকান, নীচা বাজারের কুন্ডু মিষ্ঠান্ন ভান্ডার, স্টেশন বাজারের নয়ন ও সক্লা সন্ধ্যাতে এই কাচাগোল্লা খুব ভালো পাওয়া যায়।

কেউ যদি ভ্রাম্যমাণ হকারদের থেকে কাচাগোল্লা কিনতে চান তাহলে কাচাগোল্লা কিনে তাদের ঠকতেই হবে। হকরেরা দাম ও বেশি নেয় আবার নকল মিষ্টি দিয়ে থাকে।

আরো পড়ুনঃ শিশুর যত্নে লক্ষ্যণীয় বিষয়

আরো পড়ুনঃ ভেষজ যা অ্যান্টিবায়োটিক হিসাবে কাজ করে

আরো পড়ুনঃ বুফেতে যেসব খাবার বর্জন করা উচিত

৫। বগুড়ার দই

বগুড়ার দই

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা বগুড়ার নামকরা একটি খাদ্য এই দই। বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলায় এই দইয়ের উৎপত্তি। স্থানীয়দের মতে বগুড়ার সনাতন ধর্মাবলম্বী ঘোষ সম্প্রদায় প্রথম দইয়ের ব্যবসা শুরু করেছিলেন এবং তারাই প্রথম সারা বাংলাদেশে এই দইয়ের প্রচলন শুরু করেন।

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ঘেটু ঘোষ সর্বপ্রথম দই বানানো শুরু করেন। সেই দইটি ছিল টক দই। পরে তা চিনিপাতা দই বা মিষ্টি দইতে রুপান্তরিত হয়।

বর্তমানে বগুড়ার কথা মনে পড়লেই আগে মাথায় আসে দইয়ের কথা। মূলত দধি বা দই হলো এক ধরনের দুগ্ধজাত খাদ্য যা ব্যাক্টেরিয়া দ্বারা গাজন প্রক্রিয়ায় তৈরী করা হয়। মূলত ব্রিটিশ আমল থেকেই এর খ্যাতি সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে। ষাটের দশকের প্রথম ভাগে ব্রিটেনের রানী এলিজাবেথের সময় থেকেই মার্কিনে ছড়িয়ে পড়েছে।

বগুড়ার দই প্রথমে সনাতন সম্প্রদায় তৈরী করা শুরু করলেও পরে ওই অঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠী ও এই বিখ্যাত দই তৈরী করা শুরু করেন।

টক দই মূলত বিভিন্ন রান্নায় ব্যবহার করা হয়। মেজবানি মাংস, অন্যান্য মাংস, সালাদে এই টক দই ব্যবহার করা হয়। আর মিষ্টি দই অতিথি আপ্যায়নে ব্যবহার করা হয়।

বগুড়ার কোন অঞ্চলে এমনকি আশেপাশের কোন অঞ্চলেও যেকোন উৎসব হলেই দইয়ের খুব চাহিদা থাকে। তাছাড়াও কোন পালাপার্বণ ছাড়া সময়েও এই দইয়ের খুব বেশি কদর থাকে।

আরো পড়ুনঃ

যে পাচটি খাবারে হার্ট অ্যাটাকের ঝুকি কমাবে

পাটিসাপটা পিঠার রেসিপি

আমের পুষ্টিগুণ

এসব মিষ্টি ছাড়াও বাংলাদেশে আরো সুন্দর সুন্দর অনেক মিষ্টি পাওয়া যায়। যেমন-

গুঠিয়া সন্দেশ

যশোরের জামতলার মিষ্টি

মেহেরপুরের সাবিত্রী মিষ্টি

রাজবাড়ির চমচম

ময়মনসিংহের মক্তাগাছার মন্ডা

নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টি

কুষ্টিয়ার মহিষের দুধের দই ইত্যাদি।

আরো পড়ুনঃ লিচুর উপকারিতা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
error: Content is protected !!

Adblock Detected

Please turn off your Adblocker.