খাদ্য ও খাদ্যাভ্যাস

ভোজন রসিক বাঙ্গালি ও তার রসনা বিলা সের চিরাচরিত অভ্যাসের সাতকাহন

ভোজন রসিক বাঙালির রসনা বিলাস

বাঙ্গালিকে সবসময় ভোজন রসিক বাঙ্গালি বলা হয় । আসলে বাঙালি কিন্তু নতুন নতুন ভোজন রসিক পদবী পায়নি। বরং সেই প্রাচীন আমল থেকেই বাঙালি মানেই খাওয়া দাওয়া বোঝায়। বাঙ্গালির প্রাচীন কালের ইতিহাস আছে খাওয়ার। বাঙ্গালির নিত্যদিনের খাবারেই থাকতো নানা রকম পদ। আর যদি কোন পালা পার্বণ হতো তাহলে তো কথায় নাই খাওয়া দাওয়া তো লেগেই থাকতো। ভাত, মাছ, সবজি, ভর্তা, মিষ্টি, পায়েস কোন কিছুর ই যেন বাদ থাকতো না। একের পর এক পদ যেন পাতে পড়তেই থাকতো। সেই রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের আমল থেকেই বাঙালির ভোজনের নাম রয়েছে এবং তাদের বিভিন্ন খাবারের কথাও উল্লেখ করা আছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়িতে বসতো বিদ্বজ্জনসমাগম সভা কিংবা খামখেয়ালি সভা। এই সব সভায় মুখরোচক খাবার পরিবেশিত হতো। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর হাতে তৈরি দইয়ের মালপো, মানকচুর জিলাপির মতো অদ্ভূত খাবারের আত্মপ্রকাশও নাকি এ সব আসরেই।

ঈশ্বরচন্দ্ৰ বিদ্যাসাগরের মতো মানুষও নাকি ছিলেন অত্যন্ত ভোজন রসিক। খেতে ও খাওয়াতে ভালোবাসতেন। তিনি কয়েকজন অন্তরঙ্গ বন্ধুকে নিয়ে ‘ভোজন সভা’ নামে একটি সংস্থা গড়ে তুলেছিলেন। সংস্থার প্রায় জনাদশেক সদস্য ছিলো। এই সংস্থার সদস্যরা হঠাৎ দল বেঁধে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধবের বাড়িতে গিয়ে খেতে চাইতেন। সংস্থার নাম ছড়িয়ে পড়েছিল ঘনিষ্ঠ মহলে। তাই প্রত্যেকেই সবসময় ভয়ে থাকতেন যে, এই বুঝি ভোজনসভার সভ্যদের উদয় হলো!

প্রখ্যাত বাঙালি লেখক শিবরাম চক্রবর্তী তো বলেই গেছেন, তাঁর জীবনের লক্ষ্য দুটো-‘‘খাই আর শুই’’। এক সময় শিবরাম পুরোদমে স্বদেশী আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন। রাজবন্দী হিসেবে জেলেও গিয়েছেন। তখন তাঁর এতই রোগা পটকা চেহারা ছিলো যে পুলিশ কিছুতেই তাঁকে বিপ্লবী হিসেবে আমলে নিত না। যা-ই হোক, একদিন ধরা পড়লেন, বলা ভাল নিজেই ধরা দিলেন। জেলে গিয়ে দেখা হয়ে গেলো কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনিও বন্দী তখন। তাঁকে দেখে নজরুল তো দারুণ খুশি। গানে, গল্পে কবিতায় হৈ হৈ করে সময় কাটতো তাঁদের। জেলখানায় রাজবন্দীদের খাবার নিজে হাতে রান্না করে খাওয়াতেন নজরুল। তিনি চমৎকার মোঘলাই খানা বানাতে জানতেন। বানাতেন বিরিয়ানি, পোলাও, কোর্মা, নানা রকম কাবাব, কাটলেট, মাংসের চপের মতো নানান জিভে-জল-আনা পদ। শিবরাম লিখেছেন, “মনে পড়লে এখনও জিভে জল সরে। নিজেকে সজিভ বোধ করি। আর জেলখানার সেই খানা! আহা! আমি তো বহরুমপুর জেলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত টিঙটিঙে রোগা ছিলাম। তারপরে দুইবেলা কাজির খানা খেয়ে এমন মোগলাই চেহারা নিয়ে বেরলাম যে আর রোগা হলাম না। জেলখানায় আর জেলের খানায় গড়া এই চেহারা এতটুকু টসকায়নি।”

ভোজন-রসিক-বাঙ্গালি
ভোজন-রসিক-বাঙ্গালি

বাঙ্গালির খাদ্যে ছিল না এমন কোন খবার নেই। বাঙ্গালির নামের সাথেই আষ্টে পৃষ্টে জড়িয়ে আছে খাবারের নাম। প্রাচীন স্বচ্ছল বাড়িতে নাকি এক বেলার খাবারে ৬৪ ব্যঞ্জন রান্না করা হতো। বাঙ্গালির নামের সাথে আড্ডাবাজ খ্যাতিও রয়েছে। আর আড্ডা তো আর খালি মুখে চলতে পারে না। তাই আড্ডার সাথে থাকতো জমজমাট খাওয়া দাওয়া। বাঙ্গালির বৃষ্টি মানেই খিচুড়ি, মাংস, আচার, ভাজি, ভর্তা এসব।বৃষ্টির দিনে জমজমাট আড্ডা আর খিচুড়ি। আর শীত মানে নানা রকম শাক-সবজি। সবজি আবার বিভিন্ন রঙয়ের হতো। এসব খাওয়া দাওয়া চলতো বাঙ্গালির নিত্যদিনে। এছাড়াও বাঙ্গালির শেষ পাতে একটু মিষ্টি না হলেই যেন নয়। শেষ পাতে মিষ্টি, পায়েস,পিঠা যেন লেগেই থাকতো। প্রাচীন মহিলারা বিভিন্ন ধরনের পিঠা বানাতে ভালোবাসতো।

বাঙ্গালির প্রাচীন বিভিন্ন কাব্যে খাদ্যের বিভিন্ন বনর্ণা দেওয়া আছে। যেমনঃ ‘নৈষধী চরিত’-এর রচয়িতা শ্রী হর্ষ ছিলেন দ্বাদশ শতকের কবি। (অনুবাদক ড. করুণাসিন্ধু দাস, কলকাতা, ১৯৮২)। তাঁর সেই কাব্যকথায় খাদ্যের বৈচিত্র্য এবং রন্ধনশিল্পীদের নৈপুণ্যের অনেক তথ্য রয়েছে। সেসব তথ্যের মধ্যে শ্রী হর্ষের দেয়া ভাতের বর্ণনাটিও উপভোগ করার মতো। এখানে তা তুলে দেয়ার লোভ সামলানো গেলো না—লোকেরা সাগ্রহে ভাত খেলেন, তাতে ধোঁয়া উঠছিল, ভাত মোটেই ভাঙ্গা নয়, গোটা, পরস্পর আলাদা, কোমল ভাব হারায়নি, সুস্বাদু, সাদা, সরু, সুগন্ধযুক্ত। তার লেখায় বাঙালীর আরেকটি প্রিয় খাবার দইকে বলা হয়েছে, ‘অমৃতের হ্রদ থেকে তুলে পাঁকের মতো…।’

ভাত কিন্তু বাঙালির ভোজের তালিকায় সবসময় এক নম্বরেই থাকে। সৈয়দ মুজতবা আলী বহু দেশ ঘুরেছিলেন, বহু ধরনের রান্না খেয়েছেন। আরব দেশ ভ্রমণের সময় মুরগি মোসাল্লম, শিক কাবাব, শামি কাবাবের স্বাদ পেয়েছেন। জাহাজে ঘুরে বেড়াবার সময় ইউরোপীয় খাবারও খেয়েছেন। কিন্তু ওই যে বাঙালী বলে কথা। সেই ভ্রমণ কালে আলী সাহেবের প্রাণ কাঁদছিল—চারটি আতপ চাল, উচ্ছে ভাজা, সোনামুগের ডাল, পটল ভাজা আর মাছের ঝোলের জন্য।ভাবা যায়! চিরকালের ভেতো বাঙালি মনে হয় একেই বলে। ভাত কিন্তু বাঙালির পেছন ছাড়ে না কখনোই। প্রাচীন কালের ইতিহাস বইয়ের পাতা উল্টে গেলে জানা যায়, তখন ভাত খাওয়া হতো শাক এবং অন্যান্য ব্যঞ্জন দিয়ে। দরিদ্র ও পল্লী অঞ্চলের মানুষের প্রধান খাদ্যই ছিল শাক-ভাত। নালিতা বা পাটশাকের উল্লেখ আছে ‘প্রাকৃত পৈঙ্গল’-এ। মইলি বা মৌরলা মাছ ছিলো বাঙালির প্রিয় খাদ্য। তার অর্থ দাঁড়াচ্ছে খাবারের প্রতি এই দূর্বলতা এই জাতির তখন থেকেই।

বাঙ্গালির পাতে শুধু ভাত নয় ভাতের সাথে বাঙ্গালিদের আর থাকে বিভিন্ন ধরনের পোলাও, বিভিন্ন ধরনের মাংস, ডিম,ডাল,মিষ্টি,পিঠা ইত্যাদি।

বাঙালির আনুষ্ঠানিক ভোজে নাকি খাদ্য অপচয়ের চূড়ান্ত হতো—এমন কথা লিখে গিয়েছেন চীনা পরিব্রাজক হিউ এন সাং। তার দেখা ব্যঞ্জনের তালিকায় রয়েছে দই আর রাই সরষে দিয়ে রান্না করা পদ। যা খেয়ে অতিথিদের মাথা চাপড়াতে হতো তীব্র ঝালের আক্রমণে। প্রাচীন বাঙালির প্রিয় খাদ্য ছিল হরিণের মাংস। সম্ভবত এজন্যই চর্যাপদে লেখা হয়েছে—‘‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী’’। হরিণের মাংস সুস্বাদু বলে সবাই বনে এসে আগে হরিণ শিকার করতো।

ভোজন রসিক বাঙালি

বাঙালির খাবারে তেল আর মশলার খ্যাতি বলি অথবা কুখ্যাতিই বলি সেটা বেশ বেশী মাত্রায়ই আছে। এই তেল-মশলার ব্যাপক ব্যবহারই বাঙালি রান্নার স্বাদ এবং গন্ধকে জগতে বিখ্যাত করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এক সময়ে বলা হতো সরষের তেল ছাড়া বাঙালি অচল। তেলের ব্যবহারের সূত্রেই আবিষ্কৃত হয়েছে যে সিন্ধুসভ্যতায় বাঙালি ছিল। তাদের খাদ্যসূত্র হচ্ছে, সরষের তেল এবং বিশেষ প্রজাতির চালের ব্যবহার। অর্থাৎ বাঙালি সরষে চাষ, তেল নিষ্কাশন ও তা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করছে ৪৫০০ বছর আগে থেকে। এই সরষের তেল ও মশলা সমৃদ্ধ রান্না কিন্তু ভারত এবং বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোথাও নেই।

খাঁটি বাঙালি খাবারের মেন্যুতে তেতো, বাটা, ছেঁচকি, ভাজা, পোড়া, পুর, চচ্চড়ি, ঘন্ট, সিদ্ধ, ডাল, ঝাল, ঝোল, টক, রসা, কণ্ঠা, পাতুরি, মালাইকারী, ঝাটী, পৈঠা, ধোকা, শড়শড়ি, কালিয়া, দোলমা, বাগার, সমসা ইত্যাদি রকমারি পদ্ধতিতে রান্না করা পদ থাকে। আর তাতেই বোধ হয় খাবারের ব্যাপারে বাঙালির জিব এতোটা ধারালো বলে খ্যাতি অর্জন করেছে। বছর চল্লিশ আগেও এমন রান্নার সুঘ্রাণে গোটা পাড়া ম ম করতো। এক বাড়িতে ভালো রান্না হলে বাটি চলে যেতো অন্য বাড়িতে। বাঙালি যেমন খেতে পছন্দ করে তেমনি আপ্যায়নেও তাদের জুড়ি মেলা ভার।

বাংলা সাহিত্যেও ভোজন রসিক বাঙালীর দারুন সব ছবি ছড়িয়ে আছে। মনে করার চেষ্টা করি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসাধারণ উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’র কথা্। অপু তার বাবার সঙ্গে অবস্থাসম্পন্ন এক বাড়িতে মোহনভোগ বা হালুয়া জাতীয় খাবার খেয়েছিলো। সেই মোহনভোগে ঘিয়ের পরিমাণ এত বেশি ছিল যে অপুর আঙুলে মাখামাখি হয়ে যায়। তার মনে পড়ে, মায়ের কাছে মোহন ভোগ খেতে চাইলে ‘শুধু সুজির জলে সিদ্ধ করিয়া একটু গুড় মিশাইয়া পুলটিসের মতো এক দ্রব্য তৈয়ার করিয়ে ছেলেকে আদর করিয়া খাইতে দেয়।’ আজকের মোহন ভোগ আর মায়ের তৈরি মোহনভোগের সঙ্গে অপু তফাৎ করতে পেরেও সে দরিদ্র মায়ের প্রতি করুণা ও সহানুভূতিতে পূর্ণ হয়ে গেল। ‘খাইতে বসিয়া বারবার তাহার মনে হইতেছিল অর্থাৎ তাহার দিদি এরকম খাইতে পায় নাই কখনো’। সুস্বাদু খাবার অপুর মনে বেদনারও উদ্রেক করেছিলো।

বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন, ‘‘নদের ফটিক চাঁদ, এখন আর মালপো ভোগে তেমন আস্থা নেই তার, ফাউল কারি ঠিকমতো তরিবত্ হলো কি না এ নিয়ে তার বেজায় দুশ্চিন্তা’’। ফাউল কারি আসলে মুরগির তরকারি। তখন হিন্দু সমাজে মুরগি খাওয়ার চল ছিলো না। বঙ্কিমচন্দ্রের লেখায় তৎকালীন সমাজে বাঙালীর আহারের রুচি পরিবর্তনের আঁচ পাওয়া যায়।

ভোজন-রসিক-বাঙ্গালি

জীবনানন্দ দাশ তাঁর এক লেখায় খাবারের বিবরণ দিতে গিয়ে লিখেছেন নিমি তাকে খেতে দিচ্ছে—‘‘নিমি পিঁড়ি পাতিয়া মল্লিকা ফুলের মতো পরিষ্কার অন্ন, কাঁচা কলাইয়ের ডাল, জঙ্গুলে ডুমুরের ডালনা, পুকুরের রুই মাছের ঝোল এবং দুগ্ধ আনিয়া জীবানন্দকে খাইতে দিল’’। এর পরেই নাম আসে তারাশঙ্কর, বনফুল ও বিভূতিভূষণের।তাঁদের লেখায় উঠে এসেছে বাঙালির খাদ্যরসিক মূর্তি।

তবে বাঙালির ভোজনরসিক ছবি তুলে আনতে রবীন্দ্রনাথও কম যান না। ‘নৌকাডুবি’ উপন্যাসের কমলা-রমেশের স্টিমার যাত্রার বিচিত্র সরসতা পাঠকের জন্য ভুলবার নয়। কমলার রন্ধন নৈপুণ্য এবং রমেশের সংগ্রহ ক্ষমতা মিলে সে এক রসঘন পরিস্থিতি। সজনে ডাটা, লাউডগা, বেগুন কুমড়োফুল, রুইমাছ—সব মিলিয়ে সে এক মহা আয়োজন।

বাংলাদেশের প্রয়াত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ খেতে ভালোবাসতেন। অতিথি আপ্যায়নেও তার ছিলো সুনাম। রান্না ও খাবারের প্রতি তাঁর বিশাল আগ্রহের কথা শোনা যায়। প্রচুর রান্নার বই পাঠে তাঁর ছিলো অখন্ড মনযোগ। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, অজিতকুমার চক্রবর্তী, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, অতুলপ্রসাদ সেন-সহ আরও কয়েকজনকে নিয়ে সুকুমার রায় তৈরি করেন বিখ্যাত ‘মণ্ডা ক্লাব’। এদের অনেকেই খাদ্য রসিক ছিলেন এবং তাঁরা খেতেনও প্রচুর। এমনি খাদ্য অনুরাগী লেখকদের তালিকায় নাম রয়েছে আরেক প্রয়াত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যাযের।

সৈয়দ মুজতবা আলী বোধ করি খাবারের ব্যাপারে আদর্শ বাঙালির ছাড়পত্রটি অনায়াসে পেতে পারেন। তাঁর মতে, খাদ্যের হাজারো প্রকার থাকলেও খাদক মূলত দুই প্রকারের। ভোজনপটু ও ভোজনবিলাসী। ভোজনবিলাসীরা হরেক রকমের খাবার সামনে থাকলেও বেছে বেছে খায়। আর ভোজনপটু যারা তাদের কোনো বাছ-বিচার নেই। আহার উপযোগী হাতের কাছে যা পায় তাই টপাটপ হজম করে। এরা খাবার সামনে থাকলে ভরা পেটেও খাওয়া শুরু করে।তবে বাঙালির চরিত্রে এই দুই ধরণের ভোজনরসিকতার প্রধান্যই রয়েছে।

আবার ফিরে যাই শিবরাম চক্রবর্তীর লেখায়। আগেই উল্লেখ্ করেছি রাজনীতি করতেন শিবরাম। সেজন্যই একবার তৎকালীন এক নামকরা গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তা পঞ্চানন ঘোষালের ওপর দায়িত্ব পড়লো শিবরাম চক্রবর্তীকে অনুসরণ করার। আর তাতেই মহা বিপদে পড়লেন সেই অফিসার ভদ্রলোক। কারণ রোজই শিবরাম দু’পা এগিয়ে কোনো একটা খাবার দোকানে ঢুকে মিষ্টি অথবা চপ-কাটলেট খেতে শুরু করতেন। বাধ্য হয়ে সেই অফিসারকেও সেই দোকানে ঢুকতে হতো এবং খাবারের অর্ডার দিতে হতো। সেই খেয়ে খেয়ে নিজেই মোটা হয়ে গিয়েছিলেন পঞ্চানন ঘোষাল। এই কথা জেনে শিবরাম মন্তব্য করেছিলেন, “আরে আমিও তো খেতাম কিন্তু সেই নাতিদীর্ঘই থেকে গেলাম যে, আপনার মতো হাতিদীর্ঘ হতে পারলাম না কেন?”

এই ভোজনরসিক বাঙালি অতিভোজন নিয়েও বিপদে পড়ে। খেয়ে খেয়ে হৃদযেন্ত্রের অসুখ বাড়ে, বাড়ে কোলস্টেরল, বিকল হয় লিভার। শেষে হাতপাতালে শুয়ে, পাতালে যাবার কথা ভেবে ছটফট করা। তবে মুদ্রার উল্টোপিঠ বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। আর এখানে উল্টোপিঠ হচ্ছে কম খাওয়া। বিষয়টা এখন চিকিৎসা বিজ্ঞানে মানসিক রোগ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছে। একে ‘অ্যানোরক্সিয়া নার্ভোসা’ বলে। এটি আসলে খাওয়া-দাওয়া সংক্রান্ত সমস্যা বা ইটিং ডিসঅর্ডার। এতে রোগীর মনে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়। তাঁরা খাবার খেয়ে মোটা হয়ে যাওয়ার ভয় পান। আর সেই ভয়ে খুব কম খেতে থাকেন, কখনও কখনও একেবারেই খান না। এমন কি পরবর্তীকালে খাওয়া প্রায় বন্ধই করে দেন। ব্যাপারটা তাদের কাছে নেশার মতো হয়ে দাঁড়ায়।

ভোজন-রসিক-বাঙ্গালির লোভনীয়-মিষ্টি
লোভনীয় মিষ্টি

খেয়েছিলো। সেই মোহনভোগে ঘিয়ের পরিমাণ এত বেশি ছিল যে অপুর আঙুলে মাখামাখি হয়ে যায়। তার মনে পড়ে, মায়ের কাছে মোহন ভোগ খেতে চাইলে ‘শুধু সুজির জলে সিদ্ধ করিয়া একটু গুড় মিশাইয়া পুলটিসের মতো এক দ্রব্য তৈয়ার করিয়ে ছেলেকে আদর করিয়া খাইতে দেয়।’ আজকের মোহন ভোগ আর মায়ের তৈরি মোহনভোগের সঙ্গে অপু তফাৎ করতে পেরেও সে দরিদ্র মায়ের প্রতি করুণা ও সহানুভূতিতে পূর্ণ হয়ে গেল। ‘খাইতে বসিয়া বারবার তাহার মনে হইতেছিল অর্থাৎ তাহার দিদি এরকম খাইতে পায় নাই কখনো’। সুস্বাদু খাবার অপুর মনে বেদনারও উদ্রেক করেছিলো।

বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন, ‘‘নদের ফটিক চাঁদ, এখন আর মালপো ভোগে তেমন আস্থা নেই তার, ফাউল কারি ঠিকমতো তরিবত্ হলো কি না এ নিয়ে তার বেজায় দুশ্চিন্তা’’। ফাউল কারি আসলে মুরগির তরকারি। তখন হিন্দু সমাজে মুরগি খাওয়ার চল ছিলো না। বঙ্কিমচন্দ্রের লেখায় তৎকালীন সমাজে বাঙালীর আহারের রুচি পরিবর্তনের আঁচ পাওয়া যায়।

বাধ্য হয়ে সেই অফিসারকেও সেই দোকানে ঢুকতে হতো এবং খাবারের অর্ডার দিতে হতো। সেই খেয়ে খেয়ে নিজেই মোটা হয়ে গিয়েছিলেন পঞ্চানন ঘোষাল। এই কথা জেনে শিবরাম মন্তব্য করেছিলেন, “আরে আমিও তো খেতাম কিন্তু সেই নাতিদীর্ঘই থেকে গেলাম যে, আপনার মতো হাতিদীর্ঘ হতে পারলাম না কেন?”

এই ভোজনরসিক বাঙালি অতিভোজন নিয়েও বিপদে পড়ে। খেয়ে খেয়ে হৃদযেন্ত্রের অসুখ বাড়ে, বাড়ে কোলস্টেরল, বিকল হয় লিভার। শেষে হাতপাতালে শুয়ে, পাতালে যাবার কথা ভেবে ছটফট করা। তবে মুদ্রার উল্টোপিঠ বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। আর এখানে উল্টোপিঠ হচ্ছে কম খাওয়া। বিষয়টা এখন চিকিৎসা বিজ্ঞানে মানসিক রোগ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছে। একে ‘অ্যানোরক্সিয়া নার্ভোসা’ বলে। এটি আসলে খাওয়া-দাওয়া সংক্রান্ত সমস্যা বা ইটিং ডিসঅর্ডার। এতে রোগীর মনে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়। তাঁরা খাবার খেয়ে মোটা হয়ে যাওয়ার ভয় পান। আর সেই ভয়ে খুব কম খেতে থাকেন, কখনও কখনও একেবারেই খান না। এমন কি পরবর্তীকালে খাওয়া প্রায় বন্ধই করে দেন। ব্যাপারটা তাদের কাছে নেশার মতো হয়ে দাঁড়ায়।

আরো পড়ুনঃ

Related Articles

Back to top button
error: Content is protected !!