খাদ্য ও স্বাস্থ্যকথাখাদ্য টিপস
Trending

মাংস সংরক্ষণ পদ্ধতি

মাংস সংরক্ষণ পদ্ধতি

ঈদুল আযহাতে সৃষ্টিকর্তাকে খুশি করতে ধনী গরিব সবাই যার যার সামর্থ্য অনু্যায়ী পশু কোরবানি করে থাকে। কেউ গরু, কেউ ছাগল, কেউ মহিষ, কেউ ভেড়া, কেউ উট, কেউ দুম্বা কোরবানি দিয়ে থাকে।

এই কোরবানি শেষ করার পরেই সবাই মাংস সংরক্ষণ করার কথা ভাবতে থাকে। কারণ সঠিক ভাবে মাংস সংরক্ষণ করতে না পারলে মাংসের স্বাদ, গন্ধ ও পুষ্টিগুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়।

এই ঈদে আমরা সবাইকে অনেক মাংস দেওয়ার পরেও অনেক মাংস থেকে যায়। যাদের ফ্রিজ আছে তারা কোন রকমে মাংস সংরক্ষণ করতে পারলেও যাদের ফ্রিজ নেই তারা মাংস সংরক্ষণ করতে পারে না। ফলে প্রচুর মাংস নষ্ট হয়ে যায়।

যাদের ফ্রিজ আছে তারাও আবার সঠিকভাবে মাংস সংরক্ষণের পদ্ধতি জানে না। ফলে ফ্রিজে মাংস রাখলেও সেইটা নষ্ট হয়ে যায়। আলো, তাপ, আর্দ্রতা, জীবাণু, অক্সিজেনের প্রভাবে মাংস নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তখন আর এসব মাংস খাওয়া যায় না।

মাংস সংরক্ষণের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জীবাণু, ব্যাকটেরিয়া ও পচনের থেকে মাংসকে রক্ষা করা। কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও সহজ নির্দেশনা মানলেই মাংস অনেক দিন যাবত ফ্রিজে ও ফ্রিজের বাইরেও ভালো রাখা যাবে।

মাংস সংরক্ষণের সময়কাল-

মাংসের পুষ্টিমান ও গুণাগুণ এবং স্বাদ ভালো রাখতে চাইলে অনেক বেশি দিন ফ্রিজে মাংস সংরক্ষণ করা উচিত নয়। মূলত তাজা মাংস খেতে চাইলে ক্রয় করার ২৪ ঘন্টার মাঝেই মাংস খাওয়া উচিত। তবে যদি একদম নিরুপায় হয়ে মাংস ফ্রিজে রাখতেই হয় তাহলে ১৮ ড্রিগী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গরুর মাংস ( ৮-১২ মাস ) ও মুরগির মাংস ( ৩-৬ মাস ) এর বেশি ফ্রিজে সংরক্ষণ করা উচিত নয়।

মাংস সংরক্ষণের সময় যা করা যাবে না-

তাজা মাংস সংরক্ষণের সময় অনেক বেশি সর্তক থাকতে হবে। নাহলে মাংস আর খাওয়া যাবে না। কিছু ভুল পদক্ষেপের জন্য সম্পূর্ণ মাংস সংরক্ষণ প্রক্রিয়া নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

১। রান্না করা মাংসের সাথে কখনোই তাজা মাংস রাখা যাবে না। কাঁচা মাংসের ব্যাকটেরিয়া তাজা মাংসের জন্য অনেক ক্ষতিকর।

২। সবসময় রেফ্রিজারেটরের নিচের পার্টে মাংস রাখতে হয়। নিচের অংশের ঠান্ডা তাপমাত্রা মাংসে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি কম করে।

৩। সংরক্ষণের সময় সব ধরনের মাংস আলাদা আলাদা করে রাখতে হবে। যেমন- মুরগি, গরু, ছাগল সব আলাদা করে রাখতে হবে।

৪। রান্না করার কমপক্ষে ১২ ঘন্টা আগে মাংস ফ্রিজ থেকে বের করতে হবে।

৫। মাংস যেকোন পাত্র, ব্যাগ ও প্লাস্টিকের ব্যাগে মুড়িয়ে আটকে রাখতে হবে।

মাংস সংরক্ষণ

১। মাংস ফ্রিজে রাখার আগে-

ফ্রিজে মাংস রাখার সময় বক্স থেকে প্লাস্টিকের ব্যাগে মাংস রাখাই ভালো। চর্বিযুক্ত মাংস ও চর্বিছাড়া মাংস আলাদা করে রাখা উচিত। মাংস ধুয়েই ফ্রিজে রাখা উচিত নয়। মাংস ধোয়ার পর ভালো করে পানি ঝড়িয়ে রাখা ভালো। নাহলে মাংস নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। আগেও বলেছি কাঁচা মাংসের সাথে রান্না মাংস না রাখাই ভালো। তাহলে কাঁচা মাংস থেকে ব্যাকটেরিয়া রান্না মাংসে প্রবেশ করে। সংরক্ষণের সময় প্রত্যেকটি মাংস আলাদা আলাদা করে প্যাকেট করে রাখতে হবে। এতে মাংসের গুনাগুণ ভালো থাকে।

মাংস খুব বেশিদিন ফ্রিজিং না করাই ভালো। ফ্রিজে রাখলে মাংসের স্বাদ ক্ষু্ণ্ণ হয়ে যায়। তাই মাংস লবণ ও হলুদ মাখিয়ে কিছু সময়ের জন্য ফ্রিজে সংরক্ষণ করাই ভালো।

২। কারেন্ট না থাকলে-

মাংস ফ্রিজে রাখার এক সপ্তাহের মাঝে যদি কারেন্ট না থাকে তখন খুব একটা ফ্রিজ খোলা যাবে না। এতে মাংস শক্ত হওয়ার আগে বাতাস ঢুকলে মাংস নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। মাংস সাধারণত রান্না করার ১২ ঘণ্টা পূর্বে ফ্রিজ থেকে বের করা উচিত। পানিতে চুবিয়ে মাংস গলালে স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়।

৩। রান্না মাংস ও কাঁচা মাংস-

রান্না মাংস ও কাঁচা মাংস দুটোই একরকমই। রান্না করা মাংস ও শূণ্য ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রায় ডিপ ফ্রিজে এক বছর পর্যন্ত রাখা যাবে। কিন্তু স্বাদ ও পুষ্টিগুণের তারতম্য হবে কিছুটা। ফ্রিজে মাংস রাখতে হলে বড় টুকরা করতে হবে। ছোট টুকরাতে রক্ত ও পানি জমা থাকে।

৪। ডিগ্রী ফারেনহাইট-

রান্না করা মাংস শূণ্য ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রায় রাখা যাবে। ৪০ ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রায় বা তার নিচে কাঁচা মাংস ৪-৬ দিন রাখা যাবে। এছাড়া শূণ্য ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রার নিচে রাখলে গরুর মাংস ১২ মাস ভালো থাকে।

৫। প্যাকেটের গায়ে তারিখ লিখতে হবে-

মাংস ফ্রিজে রাখার আগে প্যাকেটের গায়ে তারিখ লিখতে হবে। তাহলে মাংস কতদিন ফ্রিজে রাখা হলো তা সহজেই বোঝা যাবে।

৬। তাপমাত্রা-

মাংস ফ্রিজে রাখার আগে তাপমাত্রা ঠিক আছে কিনা তা চেক করে নিতে হবে। যে তাপমাত্রায় রাখলে মাংস ভালো থাকবে সেই তাপমাত্রায় মাংস রাখতে হবে।

৭। প্লাস্টিকের ব্যাগ-

মাংস প্লাস্টিকের ব্যাগে বা ফয়েল পেপারে রাখতে হবে। এসবে রাখলে মাংসে কোনদিন বাতাস ঢুকতে পারে না। বাতাস ঢুকলে ব্যাকটেরিয়া জন্ম নেয়। আবার প্লাস্টিকের বক্স ও ব্যবহার করা যেতে পারে।

মাংস সংরক্ষণের বিভিন্ন পদ্ধতি-

১। ডিপ ফ্রিজে সংরক্ষণ-

১। মাংস সংরক্ষণের সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো ডিপ ফ্রিজে সংরক্ষণ। মাংস ফ্রিজে রাখার আগে মাগস কাটার ধরন বা পদ্ধতি, প্যাকেজিংয়ের ধরন বুঝে মাংস সতেজ থাকে। তাই মাংস ডিপ্ ফ্রিজে রাখার আগে সেসব মেনে রাখলে মাংসের গুণাগুণ বজায় থাকে।

ডিপ ফ্রিজে মাংস সংরক্ষণ

২। ফ্রিজে সংরক্ষণ-

শুধু মাত্র গরু, খাসি নয় মুরগি মাংস ও রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। যেকোন মাংস সংরক্ষণের পূর্বে খেয়াল রাখতে হবে মাংস যেন শূণ্য ডিগ্রী ফা্রেনহাইট তাপমাত্রায় হিমায়িত করা হয়। এতে ব্যাকটেরিয়া, ইষ্ট সহ সকল জীবাণু ধ্বংস হয়ে যায়। তাছাড়া খাবার নষ্ট করার এনজাইম গুলোও নষ্ট হয়ে যায়।

যেসব মাংসে চর্বি কম থাকে সেসব মাংস তত বেশিদিন সংরক্ষণ করা যায়। মাংস সংরক্ষণের পূর্বে চর্বি ছাড়িয়ে নিলে ভালো হয়। আবার মাংস একদম বড় করে না রেখে স্লাইস করে রাখলে অনেকদিন ভালো থাকে। মাংস সংরক্ষণ করতে জিপ লক ব্যাগ ব্যবহার করাই ভালো। খুব বেশি বড় ব্যাগ ব্যবহার করা যাবে না। তাহলে বড় ব্যাগ বার বার ভিজিয়ে মাংস গলাতে হবে। বাকি মাংস গুলো নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় মাংস সংরক্ষণ করে ৪-১২ মাস পর্যন্ত খাওয়া যায়। কিমাজাতীয় গরুর মাংস বা খাসির মাংস ৩-৪ মাসে বেশি ফ্রিজে রাখা উচিত নয়। রান্না করা মাংস ২-৩ মাস ফ্রিজে রাখা যেতে পারে। এর বেশি রাখলে পুষ্টিগুণ হারাবে।

মাংস সবথেকে বেশি ভালো থাকে জিপ লক ব্যাগে। প্লাস্টিক ব্যাগ বা প্লাস্টিক বক্স ব্যাবহার না করাই ভালো। মাংস সংরক্ষণের আগে সঠিক পাত্রে রাখা ভালো। মাংস ফ্রিজে রাখার আগে ভালো করে পরিষ্কার করে ধুয়ে রাখতে হবে।

৩। ফ্রিজ ছাড়া মাংস সংরক্ষণ-

ক) ড্রাইং পদ্ধতিঃ

আগে যখন ফ্রিজ ছিল না বা এখনো যাদের ফ্রিজ নেই তারা এই পদ্ধতিতে মাংস সংরক্ষণ করে থাকে। মাংস রোদে বা চুলায় জ্বাল দিয়ে ৭০-৮০ ড্রিগী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় পানি শুকিয়ে নিতে হয়। মাংসের চর্বি ফেলে পাতলা করে কেটে ভ্যাকিউম সিল্ড করে ১ বছর পর্যন্ত রাখা যায়। এই পদ্ধতিতে খরচ খুব কম হয়।

খ) সল্টিং বা লবণ পদ্ধতি-

এই পদ্ধতিতে লবণ, মশলা, ব্রাউন চিনি, কিউরিং লবণ, সোডিয়াম নাইট্রেট ও সোডিয়াম ল্যাকটেট দিয়ে মাংস মেখে ২৪ ঘণ্টা রেখে ফ্রিজে ১ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। সল্টিং পদ্ধতিতে মাংস অনেক দিন টাটকা থাকে ও পুষ্টিমান বজায় থাকে।

গ) স্মোকিং পদ্ধতি-

এটি একটি পুরোনো পদ্ধতি। হট স্মোকিং ৩০০ ড্রিগী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ও কোল্ড স্মোকিং ৮৫ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় পোড়াতে হয়। এর ফলে সকল অণুজীবাণূ মরে যায়।

) ক্যানিং পদ্ধতি-

এ পদ্ধতিতে ২৫০ ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রায় ড্রাই করে ঠান্ডা করা হয়। তারপর কাচের জারের মুখ বন্ধ করে ১২ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়।

) সিরকা বা ভিনেগারে ডুবিয়ে-

প্রথমে দু বা তিনকেজি মান্সে ৪ টেবিল চামচ বিট লবণ ও ৪ টেবিল চামচ বাদামি চিনি মাখিয়ে ১ লিটার সিরকা বা ভিনেগারে সম্পূর্ণ ঢুবিয়ে রাখতে হবে। এভাবে ১ বছরের মধ্যে মাংস সংরক্ষণ করতে হবে।

চ) জ্বাল দিয়ে সংরক্ষণ-

জ্বাল দিয়ে মাংস সংরক্ষণ করতে চাইলে মাংস ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। ১ কেজি মাংসে এক কেজি চর্বি, পরিমাণ মতো হলুদ ও লবণ মাখিয়ে জ্বাল দিতে হবে। এই মাংস দিনে দুবার জ্বাল দিতে হবে।

আরো পড়তে পারেন-

ঈদের খুশিতে হয়ে যাক মাটন রোস্ট

ফ্রিজে খাবার রাখার সময় যেসব বিষয় মানতে হবে

জাপানিজ খাবার

বুফেতে যেসব খাবার বর্জন করা উচিত

যে পাচটি খাবারে হার্ট অ্যাটাকের ঝুকি কমাবে

হৃদরোগ থেকে বাচতে মাংসের এসব পদ খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।

Related Articles

Back to top button
error: Content is protected !!

Adblock Detected

Please turn off your Adblocker.