মামা ও শিশু

মায়ের বুকের দুধ বৃদ্ধির উপায় ও দুধ বৃদ্ধির জন্য খাদ্য

একটা শিশুর জন্য মায়ের বুকের দুধের থেকে আর কোন ভালো খাবার হতেই পারে না। শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য মায়ের দুধের বিকল্প নেই। তাই শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য শিশুকে পর্যাপ্ত পরিমাণে বুকের দুধ দিতে হবে।

বুকের দুধে প্রাকৃতিক অ্যান্টি অক্সিডেন্ট আছে যা শিশুর শরীরে ইনফেকশন রোধ করে। সব শিশুই যে পর্যাপ্ত পরিমাণে দুধ খেতে পারবে তার কোন মানে হয় না।

যেসব মায়ের বুকে দুধ কম আসে বা মায়েরা সঠিকভাবে দুধ খাওয়াতে পারে না তাদের সন্তানেরা ফর্মুলা মিল্ক খেয়ে বড় হতে থাকে। এসব ফর্মুলা মিল্ক মায়ের বুকের দুধের সমকক্ষ কখনোই হতে পারে না। এসব দুধ খেলে বাচ্চাদের বিকাশ সঠিকভাবে হয় না। বাচ্চাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে।

অনেক মায়েরা আবার বাচ্চারা দুধ পায় না বলে দুধ বাড়ানোর ট্যাবলেট খেয়ে থাকে। এসব ট্যাবলেট মা ও শিশু উভয়ের জন্যই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই প্রাকৃতিক উপায়ে দুধ বাড়ানোর কিছু উপায় দেওয়া হলো-

১। বাচ্চাকে সঠিক পদ্ধতিতে দুধ খাওয়ানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাচ্চাটি স্তনবৃন্তটি যদি মুখে ধরে রাখতে না পারে তাহলে সেটি ভুল অবস্থানে থাকে বলে বাচ্চাটি দুধ পায় না। মায়ের পর্যাপ্ত স্তনদুধ উতপন্ন হতে পারবে যদি স্তন সম্পূর্ণভাবে খালি থাকে। বাচ্চা যদি দুধ খেতে না পারে তাহলে স্তনের দুধ শেষ হবে না। আবার দুধ উৎপন্নও হবে না। তাই দুধ ফেলে দিতে হবে।

২। নবজাতককে ঘন ঘন দুধ চোষাতে হবে। ঘন ঘন দুধ চুষলেই মায়ের স্তনে দুধ আসবে। বুকে দুধ হওয়ার জন্য দুইটি হরমোন কাজ করে। একটি প্রলেকটিন ও অপরটি অক্সিটোসিন। শিশু যত বেশি দুধ টানবে তত মায়ের মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি উদ্দীপিত হবে। তখন প্রলেকটিন উৎপন্ন হবে। তখন মায়ের দুধ বেশি হবে। তাই মায়ের দুধ বেশি হওয়ার অন্যতম উদ্দীপক হচ্ছে শিশুর দুধ টানা বা চোষা।

৩। শিশুকে দৈনিক নিয়ম করে নির্দিষ্ট সময়ে নিয়ম করে বিরতি দিয়ে রুটিনমাফিক খাওয়াতে হবে। কিন্তু যখন স্তনে দুধ আসবে তখন একটু করে শিশুকে চাটাতে হবে। তাহলে পরবর্তীতে ভালো দুধ পাওয়া যাবে।

৪। মাকে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে। মায়ের শরীর যেন সবসময় হাইড্রেটেড থাকে তাই জন্য মাকে সবসময় প্রচুর পানি পান করতে হবে। প্রতিদিন অন্ততপক্ষে ৮-১২ গ্লাস পানি পান করাতে হবে। এটি শিশুর শরীরে প্রাকৃতিকভাবে দুধ বৃদ্ধি করে।

৫। শিশুকে একইসাথে মায়ের বুকের দুধ ও বোতলের দুধ খাওয়ালে বুকের দুধ খাওয়ার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। জন্মের এক বা দুইদিনে যদি শিশুকে ২/৩ বোতল ফর্মুলা মিল্ক খাওয়ানো হয় তাহলে শিশু আর মায়ের বুকের দুধ চেটে খেতে চাইবে না।

৬। শিশুকে দুধ খাওয়ানোর সময় চেষ্টা করতে হবে দুইটা স্তনই যেন শিশুকে খাওয়ানো হয়। একটা স্তন খাওয়ানো হলে পাশ ফিরে আরেকটি স্তন খাওয়াতে হবে। একটি স্তন যদি সবসময় খাওয়ানো হয় তাহলে বাকি স্তনে আর দুধ আসবে না।

৭। শিশুকে বারবার খাওয়াতে হবে। শিশু যতবার চাইবে ততবারই শিশুকে খাওয়াতে হবে। শিশুকে সময় নিয়ে খাওয়াতে হবে। যতক্ষণ ধরে সে খেতে চাইবে তত সময় নিয়েই তাকে খাওয়াতে হবে। মনে রাখতে হবে, শিশু যত দুধ খাবে ততই স্তনে দুধ উৎপন্ন হবে। স্তনের দুধ খালি হলেই আবার দুধ উৎপন্ন হয়। তাকে শিশুকে বার বার দুধ খাওয়াতে হবে।

৮। শিশু দুধ পাচ্ছে না বলে তাকে কখনোই ফর্মুলা মিল্ক দেওয়া যাবে না। তাহলে শিশু না খেতে খেতে মায়ের দুধ আরো কমে যাবে। শিশুকে মুখে কখনো পেসিফায়ার দেওয়া যাবে না। তাহলে শিশুর নিপল কনফিউশন হবে। আগে থেকে স্তন থেকে দুধ পাম্প করে রেখে সেই দুধ শিশুকে চামচ বাটিতে দেওয়া যেতে পারে।

৯। শিশুর মুখে কোন ধরনের বোতল বা চুষনি দেওয়া যাবে না। এতে করে পরর্বতীতে শিশু আর দুধ চাটতে চাইবে না।

১০। প্রথম দিকে দুধে পানির পরিমাণ বেশি থাকে। দুধ খুব পাতলা হয়। পরের দিকে দুধে পুষ্টি উপাদান বেশি থাকে। পানির পরিমাণ কম থাকে। তাই সামান্য খাইয়ে অন্য স্তনে যাওয়া যাবে না। একবার এক স্তনের দুধ খাওয়ানোই ভালো। তবে পরের বার শিশু খেতে চাইলে বাকি স্তন পান করাতে হবে।

১১।শিশুকে যখন দুধ পান করানো হবে তখন যেন মা চিন্তামুক্ত থাকে। শিশু যখন খেতে চাইবে না তখন তাকে জোর করে খাওয়ানো যাবে না। শিশুকে খাওয়ানোর সময় নিরিবিলি কোন ঘরে নিয়ে খাওয়াতে হবে। আস্তে আস্তে ধৈর্য্য ধরে শিশুকে খাওয়াতে হবে। যখন শিশু হাঁ করবে তখন তাকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে যত্নসহকারে খাওয়াতে হবে।

১২। অনেক সময় শিশু ঘুমিয়ে থাকলে মা শিশুকে খাওয়াতে চায় না। কিন্তু তখনও শিশুকে খাওয়াতে হবে। তার পায়ে সুড়সুড়ি দিয়ে উঠিয়ে খাওয়াতে হবে।

সর্বোপরি মায়ের বুকের দুধ ভালো পেতে হলে মাকে পুষ্টিকর খাদ্য খেতে হবে। যেমন-

মা শিশুকে দুধ খাওয়াচ্ছে

১। মাকে প্রতিদিন এক গ্লাস করে গরম দুধ পান করতে হবে। গরম দুধে এক চা চামচ জিরা গুঁড়া মিশিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে। এটি প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে খেলে খুব ভালো উপকার পাওয়া যায়। এতে বুকের দুধ বৃদ্ধি পায় ও মায়ের শরীরের আয়রনের অভাব মিটে।

২। মায়ের খাদ্যাভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। মায়ের খাদ্যতালিকায় প্রতিদিন ডিম, দুধ, সবুজ শাকসবজি, ফল, কচি মুরগী ইত্যাদি খেলে শরীর সুস্থ ও সবল থাকবে। পাশাপাশি মায়ের দুধ বৃদ্ধি পাবে।

৩। মায়ের খাওয়ার দুধে স্বাদ বৃদ্ধির জন্য দুধের সাথে এক চা চামচ দারুচিনি মিশিয়ে নিতে পারেন। এতে মা দুধ ভালোভাবেই খেয়ে নিবে এবং এটি মায়ের দুধ বৃদ্ধি করতেও সাহায্য করে।

৫। মাকে প্রতিদিন সকালে উঠে ৩ কোয়া করে রসুন খেতে হবে। কাঁচা রসুন খেতে না পারলে রান্নায় রসুন ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া এক কাপ পানিতে ৩ কোয়া করে রসুন দিয়ে ফুটিয়ে পানি অর্ধেক হয়ে এলে তাতে এক কাপ দুধ দিয়ে ফুটিয়ে খেতে পারেন। এতে স্বাদ বৃদ্ধির জন্য মধু ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি প্রতিদিন সকালে খেতে হবে।

৬। মাতৃদুগ্ধ বৃদ্ধির জন্য বহুকাল আগে থেকেই মেথির বীজ খাওয়ানো হয়ে থাকে। এটি ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ যা শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে সাহায্য করে। মেথি বীজ ও পাতা উভয়ই ব্যবহার করা যেতে পারে।

চা বানানোর সময় মেথির বীজ দিয়ে দেওয়া যেতে পারে। তাছাড়া সবজিতে বীজ দিয়ে রান্না করে খাওয়া যেতে পারে। আবার রুটি বা পরোটা বা কচুরি বানানোর সময়ও ব্যবহার করা যেতে পারে।

৭। বুকের দুধ বাড়ানোর জন্য পাশাপাশি মায়ের গ্যাস, পেটের পীড়া কমাতে মৌরি ব্যবহার করা হয়। এক গ্লাস পানিতে এক চা চামচ মৌরি ভিজিয়ে খাওয়া যেতে পারে। আবার চায়ের সাথে মিশিয়েও খাওয়া যেতে পারে।

৮। বুকের দুধ বাড়ানোর জন্য তিল বা তিলের বীজ ও ব্যবহার করা যেতে পারে। তিলের বীজ ক্যালসিয়ামের খুব ভালো উৎস। প্রসবের পরে মায়ের কর্মক্ষমতা ফিরে পেতে এই বীজ খাওয়া যেতে পারে। আমাদের প্রতিদিনের রান্নায় তিলের বীজ ব্যবহার করা যেতে পারে। অথবা মিষ্টি জাতীয় খাবার তিলের বীজ ব্যবহার করে মাকে খাওয়ানো যেতে পারে।

৯। বুকের দুধ বৃদ্ধিতে কাঁচা পেপে খুব ভালো কাজ করে। কাঁচা পেপে খেলে মনে প্রশান্তি জন্মে আবার ভালো ঘুমও হয়। কাঁচা পেপের সবজি ও খেতে পারেন। আবার সালাদের সাথেও কাঁচা পেপে খাওয়া যেতে পারে। এটি মায়ের বুকের দুধ বৃদ্ধিতে খুব ভালো কাজ করে।

১০। গাজর স্তন্য দুধ বৃদ্ধি করে। এতে খুবভালো পরিমাণে ভিটামিন থাকে। কাঁচা গাজর সবজিতে দিয়ে বা সালাদের সাথেও খাওয়া যেতে পারে। সকালে এক কাপ গাজরের রস খেলেও বেশ ভালো উপকার পাওয়া যায়। গাজর বুকের দুধ বৃদ্ধির অন্যতম একটি উৎস।

১১। করোলাতে উচ্চমানের পুষ্টিগুণ রয়েছে। এতে প্রচুর পরিমাণে পানি তাহকে যা শরীরকে হাইড্রেটেড রাখে। এটি সহজপাচ্য ও স্তন্যদুধ বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। যারা করোলা খেতে পছন্দ করে না তাদের অন্য কোন সুস্বাদু উপায়ে করোলা রান্না করে খাওয়ানো যেতে পারে।

১২। মিষ্টি আলুতে প্রচুর পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট থাকে যা শরীরের শক্তি বৃদ্ধি করে। মিষ্টি আপুতে ভিতামিন-সি, ভিতামিন-বি কমপ্লেক্স এবং ম্যাগনেশিয়াম থাকে। মিষ্টি আলুকে বিভিন্ন উপায়ে সুস্বাদু করে রান্না করে খাওয়া যায়। এটি বুকের দুধ বৃদ্ধিতে খুব ভালো ভূমিকা রাখে।

১৩। সজনে ডাটা লৌহ ও ক্যালসিয়ামের খুব ভালো উৎস। এটি গর্ভাবস্থায় দুধের উতপাদন বৃদ্ধি করে। দুপুরের খাবারে বা রাতের খাবারে সজনে ডাটা ভালো করে রান্না করে খাওয়া যেতে পারে।

১৪। ছোলাতে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন ও ফাইবার থাকে। এটি যে কারো জন্যই খাওয়া খুব ভালো। ছোলাতে ভিটামিন-বি কমপ্লেক্স এবং ক্যালসিয়াম থাকে যা মায়ের বুকের দুধ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

১৫। বার্লি মায়ের দুধ বৃদ্ধি করে। মায়ের শরীরকে হাইড্রেটেড করে। বার্লি শরীরের পানির ভারসাম্য বজায় রাখে। বার্লি সালাদ হিসাবে খেতে পারেন আবার সারারাত ভিজিয়ে রেখে পরদিন সকালে পানি সহকারে খেতে পারেন। এতে মায়ের দুধের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।

এছাড়া মাকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে হবে। তাহলে শিশুর ও মায়ের উভয়ের শরীরই ভালো থাকবে। মায়ের দৈনিকের খাবারে কিছু বাদাম রাখা যেতে পারে।

বর্তমানে প্রতিটি হাসপাতাল বা ক্লিনিকেই ব্রেস্ট ফিডিং কাউন্সিলিং বুথ থাকে যেখান থেকে মায়েরা তাদের প্রতিটি সমস্যার সমাধান চাইতে পারে। একজন সুস্থ মায়ের বুকে দুধ না আসার কোন কারণ নেই। তাই বেশি দুশ্চিন্তা না করে ধৈর্য্য ধরতে হবে। সবশেষ একটাই কথা মায়ের দুধের বিকল্প কিছুই হতে পারে না। তাই শিশুকে মায়ের বুকের দুধ পান করান।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button