অন্যান্যরোগতত্ত্ব

লিভার সিরোসিসের খাদ্যব্যবস্থা জেনে নিন

লিভার সিরোসিসের খাদ্যব্যবস্থা

যকৃতের কোষগুলি বেশী মাত্রায় ক্ষতিসাধন হতে থাকলে শেষে যে অবস্থার সৃষ্টি হয় তাকে সিরোসিস বলে। সংবহন তন্ত্রের রোগ অথবা দীর্ঘমেয়াদী সংক্রামক হেপাটাইটিস থেকে এ রকম হতে দেখা যায়। এছাড়া ক্রমাগত মদ্যপান করার অভ্যাস থাকলেও যকৃতের সিরোসিস হতে পারে। অধিক মদ্যপান করলে ক্ষুধা নষ্ট হয় এবং এরূপ চলতে থাকলে অন্যান্য খাদ্য উপাদান বিশেষ করে ভিটামিনের অভাব দেখা দেয়। মদ্যপায়ীদের মধ্যে ভিটামিন-বি ১ এর অভাবজনিত স্নায়ু প্রদাহ বা অঙ্গ প্রত্যঙ্গের উপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হারানো এ অবস্থার একটি বিশেষ লক্ষণ। মদ্য একটি শর্করা জাতীয় উপাদান। মদ্যপান অধিক মাত্রায় করতে থাকলে দেহে প্রোটিনের অভাব ঘটে, এর ফলে যকৃতে স্নেহ পদার্থের বিপাক ব্যাহত হয়। এতে যকৃতের কোষকলা ক্রমাগত অকেজো ও নির্জীব হয়ে পড়ে এবং অবশেষে যকৃতের স্থানে স্থানে ক্ষপ্তযুক্ত কোষকলা দ্বারা পূর্ণ হয়ে যায়। সঠিক সময়ে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে অত্যাবশকীয় পুষ্টি উপাদানগুলি দেহে প্রবিষ্ট করালে যকৃত আবার সচল ও পুনর্জীবিত হয়ে উঠতে পারে। নাহয় যকৃত সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেলে রোগীকে বাচানো সম্ভব নয়।

সিরোসিরের লক্ষণঃ সিরোসিস হলে জন্ডিসের লক্ষণগুলি তো প্রকাশ পাবেই এছাড়া যকৃতের আয়তন খুব বড় হয়ে যায়। যকৃতে চর্বিময় কোষকলার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এসময় রক্ত পরীক্ষা করলে দেখা যাবে, রক্তের প্রোটিন বিশেষ করে এলবুমিনের পরিমাণ খুব কমে গেছে। এর সাথে ইডিমা হবে বা শরীরে পানি জমে যাবে। এই অবস্থায় সময়মতো চিকিৎসা না করলে যকৃতে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়ে শিরায় পানি ও লবণ জমতে পারে। সিরোসিস হলে পেটে পানি জমে ফুলে যাওয়া একটা প্রধান লক্ষণ হিসাবে বিবেচিত হয়।

লিভার সিরোসিস

খাদ্যব্যবস্থাঃ এই রোগের খাদ্য ব্যবস্থা এমন করতে হবে যেন অধিক প্রোটিন, অধিক শর্করা, মাঝারি স্নেহ এবং সর্বোপরি অধিক ক্যালরি থাকে।

অধিক প্রোটিনঃ সিরোসিস রোগীর খাদ্যে অধিক প্রোটিনের ব্যবস্থা করতে হয়। প্রোটিন বেশী খেলে যকৃতের যেসব কোষকলা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়নি সেগুলি পুনরায় উজ্জীবিত হতে থাকে। যকৃতে স্নেহপদার্থের বিপাক কার্যকে চালু করে রক্ত মাধ্যমে বিভিন্ন কোষকলায় সরিয়ে দেওয়ায় প্রোটিনের ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে কোলিন বা মেথিওনিন যকৃতে লেসিথিন সংশ্লেষণে সাহায্য করে এবং এতে করে স্নেহপদার্থের অপ্সারণ সম্ভবপর হয়। এতে করে চর্বিবহুল যকৃত, স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পায়। অধিক প্রোটিন রক্তের এলবুমিনের পরিমাণ বাড়িয়ে ইডিমা কমাতে সাহায্য করে। সুতরাং যকৃতের রোগ হলে আহার্যে মাছ, মাংস, মুরগী, ডিম, দুধ ইত্যাদি উচ্চমানের প্রোটিন দেওয়া উচিত।

অধিক শর্করাঃ শর্করাবহুল খাদ্য এ সময় সহজে বিপাক হয় বলে ভাত, রুটি, আলু, চিনি, মধু ইত্যাদি যকৃতের রোগে প্রচুর দেওয়া হয়ে থাকে।

পরিমিত স্নেহঃ কিছুকাল আগেও মনে করা হতো যে যকৃতের রোগে স্নেহপদার্থ না কমালে রোগ আরো বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু এখন বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে পরিমিত স্নেহপদার্থ খাদ্যে থাকা প্রয়োজন। তবে এই স্নেহ অত্যন্ত সহজপাচ্য হওয়া দরকার। স্নেহপদার্থ খাদ্যকে সুস্বাদু করে এবং এতে করে রোগীকে প্রয়োজনীয় ক্যালরি সরবরাহ করা সম্ভবপর হয়। দুধ, সর, মাখন, ডিম ইত্যাদির স্নেহপদার্থ রোগীকে দেওয়া যেতে পারে। তবে ভাজা খাদ্য ও মাংসের চর্বি দেওয়া ঠিক নয়-কারণ এই চর্বি যকৃতের রোগীর জন্য পরিপাক করা কঠিন। যকৃতের রোগীর খাদ্য অল্প পরিমাণ সয়াবিন তেল দিয়ে রান্না করা ভালো। রান্নার তেল ও খাদ্যের নিহিত স্নেহপদার্থ মিলে মোট ৬০-৮০ গ্রাম স্নেহপদার্থ গ্রহণ করা যেতে পারে।

ভিটামিনঃ এসময় প্রচুর ভিটামিন প্রয়োজন। সকল রকম ভিটামিন বিশেষ করে থায়ামিন রোগীর যকৃতে চর্বি জমার অবস্থা থেকে মুক্ত রাখে। যকৃতের রোগে ভিটামিন শোষণের হার কমে যায় সেজন্য অতিরিক্ত ভিটামিন দেওয়া দরকার হয়। গরুর বা খাসির কলিজা সিদ্ধ করে তার নির্যাস খাওয়ানো যেতে পারে। তাছাড়া উচ্চমানের ভিটামিন ট্যাবলেট এই সময়ে অবশ্যই দিতে হবে। প্লাজমার প্রথম্বিন কম থাকলে অবশ্যই খাদ্যে ভিটামিন কে এর ব্যবস্থা করতে হবে।

লবণঃ শরীরে পানি জমলে আহার্যে লবনের পরিমাণ কমিয়ে ফেলা দরকার। মাংস, দুধ ও ডিমে যথেষ্ট সোডিয়াম থাকার কারণে এগুলির পরিমাণ সীমিত করতে হবে। এর পরিবর্তে মাছ ও ডাল যোগ করে প্রোটিনের পরিমাণ ও গুণগত মান ঠিক রাখতে হবে। উন্নত দেশসমূহে অল্প সোডিয়ামযুক্ত দুধ ব্যবসা ভিত্তিতে প্রস্তুত ও বিক্রয় হয়। এগুলি পাওয়া গেলে সিরোসিস আক্রান্ত ব্যক্তি খেতে পারেন।

খাদ্য আশঃ এ সময় অনেকের খাদ্যনালীতে ঘা বা ক্ষত হয়। এই কারনে বেশী আশযুক্ত খাদ্য যেমন কাঁচা ফল ও সালাদ, বড় আশযুক্ত মাংস ও ভুষিযুক্ত আটা না খাওয়াই ভালো।

রোগীর অবস্থা আশঙ্কা জনক পর্যায়ে গেলে রোগীর ক্ষুধা একেবারেই থাকে না এবং কিছু খেলে বমি হয়ে যায়। এসময় মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা লোপ পায় এবং রোগী বোধশক্তিহীন হয়ে পড়ে। এর সাথে অস্থিরতা, বিপর্যস্ততা, ত্নদ্রালুতা ইত্যাদি লক্ষণ থাকায় রোগীকে খাওয়ানো সহজ হয় না। এসময় প্রোটিন ও স্নেহ একেবারে বাদ দেওয়ার দরকার পড়ে। এ অবস্থায় চিকিৎসকগণ শিরার মাধ্যমে দেহে গ্লুকোজ প্রবেশ করিয়ে থাকেন। রোগীর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে তখন তরলীকৃত খাদ্য অল্প অল্প করে দেওয়া হয়। এইরূপ খাদ্যে খুব সামান্য পরিমাণ প্রোটিন ( ২০ গ্রামের বেশী না হয় ) ও কম পরিমাণে সোডিয়াম দেওয়া হয়। ৫০০ গ্রাম মাখন তোলা দুধে প্রায় ১৫ গ্রাম প্রোটিন পাওয়া যায়। এই রকম দুধ, ফলের রস ও গ্লুকোজ দিয়ে এইরুপ রোগীর জন্য পথ্য প্রস্তুত করতে হয়।  অবস্থা উন্নতির দিকে যেতে থাকলে প্রোটিন, শর্করা ও ক্যালরির পরিমাণ বাড়াতে হয়। তবে চর্বি বা স্নেহপদার্থ ও লবণ যেন কম থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এসময় খাদ্যে অনীহা থাকায় ক্যালরির চাহিদা পূরণ সম্ভব হয় না এজন্য অত্যন্ত রুচিকর ও সুস্বাদু খাবার ঘন ঘন দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত। রোগী যদি বিশেষ কোন খাবার খেতে আগ্রহ প্রকাশ করে তবে তা স্নেহবহুল হলেও দেওয়া উচিত।

আরো পড়ুনঃ

জন্ডিসে আক্রান্ত হলে খাদ্যব্যবস্থা জেনে নিতে পারেন

বাত থেকে মুক্তির উপায়

জ্বর হলে করণীয়

ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের উপসর্গ ও লক্ষণ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
error: Content is protected !!

Adblock Detected

Please turn off your Adblocker.