মা ও শিশুশিশু

শিশুর যত্নে লক্ষ্যণীয় বিষয়

একটি শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে তখন তাকে ঘিরে পুরো বাসায় খুশি ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি তাকে ঘিরে সবার প্রস্তুতির কোন শেষ থাকে না। শিশুর কিভাবে যত্ন নিবো, কিভাবে সে ভালো থাকবে, কখন তার কোন রকম যত্ন লাগবে এসব ভেবে মা বাবারা সর্বদা চিন্তিত থাকে।

শিশুকে কিভাবে যত্ন করে খাওয়াতে হবে, কিভাবে গোসল করাতে হবে, কিভাবে তার মালিশ করাতে হবে এসব নিয়ে চিন্তা থাকে। আর বাবা মা যদি হয় নতুন তাহলে তো এসব চিন্তার আর শেষই নেই। তাই মা বাবাকে নিশ্চিন্ত করতে নবজাতকের যত্ন নিয়ে থাকছে কিছু কথা।

আরো পড়ুনঃ স্তন্যদানকারী মায়ের খাদ্য

নিজের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা

শিশুর কাছে যাওয়ার আগে নিজেকে ভালো করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে নিতে হবে। নিজের সমস্ত দেহ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে নিতে হবে। নিজের জামা কাপড় ভালো করে ধুয়ে রাখতে হবে।

প্রতিবার এগুলো সম্ভব না হলেও অন্তত প্রতিবার নিজের হাত ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। সবসময় যদি পানি দিয়ে হাত নাও ধুতে পারেন স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে।

এসব করলে শিশুর যেকোন ধরনের সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকবে না। বিশেষ করে এই করোনাকালীন সময়েতে শিশুকে কোলে নেবার আগে অনেক কিছুই চিন্তা করে সবাই নিজেরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হতে হবে। পরিবারের সবাই যেন শিশুকে ধরার আগে ভালো করে হাত স্যানিটাইজ করে সে ব্যপারে লক্ষ্য রাখতে হবে।

আরো পড়ুনঃ গর্ভবতী মায়ের খাদ্য ব্যবস্থা

শিশুকে খাওয়ানোর সময়

শিশুর দুধ খাওয়ানোর সময় ও শিশুর দুধ খাওয়ানোর রীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর দুধ কিভাবে বসে খাওয়ালে সে ভালোভাবে দুধ পাবে সেইটা খুব বড় বিষয়। আবার শিশুকে প্রতি ২/৩ ঘণ্টা অন্তর অন্তর দুধ খাওয়াতে হবে।

শিশুকে প্রতিদিন রাতে ৮-১০ বার দুধ খাওয়াতে হবে। শিশুকে প্রথম ছয় মাস পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। শিশুর জন্য মায়ের দুধ খুবই উপকারী কারণ মায়ের দুধে সকল প্রকার পুষ্টি উপাদান থাকে এবং শিশুর বর্ধন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

শিশুর বয়স ছয় মাস পার হয়ে গেলে শিশুর পরিপূরক খাদ্য দিতে হবে। যেসব বাচ্চারা মায়ের বুকের দুধ পায় না তাদেরকে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ফর্মূলা মিল্ক খাওয়ানো যেতে পারে। তবে সেটা খাওয়ানোর আগে সেটার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার তারিখ, পুষ্টিউপাদান, গুণগত মান, সঠিক পরিমাণ ইত্যাদি জেনে নিতে হবে।

দুধ খাওয়ানোর পরে শিশুর কোন ধরনের সমস্যা হচ্ছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কোন সমস্যা হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

আরো পড়ুনঃ ত্বকের যত্নে অলিভ অয়েল এর উপকারিতা বা অপকারিতা।

শিশুর ঢেকুর তোলা

শিশুদের প্রতিবার খাওয়ানোর পর একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ঢেকুর তোলানো হয়। বাচ্চারা খাওয়ার পরে প্রচুর বাতাস খেয়ে ফেলে। তাই তাদের পেটে গ্যাস জমতে থাকে।

গ্যাসের ফলে শিশুর পেটে ব্যথাও হয়। শিশুর পেটের এই বাতাস বের করা হয় ঢেকুর তুলিয়ে। এই ঢেকুর তুলাতে শিশুকে মায়ের বুকের কাছে এক হাত দিয়ে ধরে রাখতে হবে।

শিশুর চিবুক মায়ের কাধে এলিয়ে দিতে হবে। মায়ের আরেক হাত দিয়ে শিহসুর পিঠে আস্তে আস্তে টোকা দিয়ে দিয়ে গ্যাস বের করা হয়।

আরো পড়ুনঃ বদহজম ও খাদ্যব্যবস্থা

শিশুর জিহ্বা পরিষ্কার

শিশু যেহেতু সবসময় দুধ খায় তাই শিশুর জিহ্বায় একধরনের সাদা আস্তরণ পড়ে যায়। এই ধরনের আস্তরণের ফলে শিশুর জিভে ঘা হতে পারে।

তাই শিশুর জিভ পরিষ্কার নরম কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করে দিতে হবে। সপ্তাহে একদিন হলেও শিশুর জিভ পরিষ্কার করে দিতে হবে।

আরো পড়ুনঃ ডায়রিয়া হলে হতাশ না হয়ে চিকিৎসা জানুন

শিশুর নখ কাটা

শিশুর নখ খুব দ্রুত বড় হতে থাকে। শিশুর নখ থেকে বড়দের আচড় লেগে যেতে পারে। আবার তার নিজের গায়েও আচড় লাগতে পারে।

শিশুদের ত্বক খুবই সেনসিটিভ তাই আচড় থেকে ঘাও হয়ে যেতে পারে। তাই সাবধানে শিশুর নখ কেটে দিতে হবে। জাগনো অবস্থায় না কাটতে পারলে শিশু ঘুমিয়ে গেলে তার নখ কেটে দিতে হবে।

নখ কাটতে বেবি নেইলকাটার ব্যবহার করতে হবে। শিশুর নখ কাটার আগে নেইলকাটার জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। একটু বড় হলে বাচ্চার নখও বড় হয়ে যায়। তখন শিশুর গোসলের পরে নখ কেটে দিতে হবে।

আরো পড়ুনঃ মস্তিষ্কের জন্য সেরা খাবার

শিশুর চোখের যত্ন

শিশুর চোখে প্রায়ই ময়লা দেখা যায়। এসব ময়লা কখনোই খালি হাতে পরিষ্কার করা উচিত নয়। নরম সুতি কাপড় কুসুম গরম পানিতে ভিজিয়ে শিশুর চোখে দেওয়ার আগে পানি ঝরিয়ে নিয়ে চোখে আলতো করে চেপে চেপে মুছে দিতে হবে।

যাতে শিশুর চোখে ব্যথা না লাগে এবং চোখে ময়লা যেয়ে কোন ধরনের অসুখ সৃষ্টি না হয়। শিশুর চোখ মোটা কোন কাপড় দিয়ে মুছলে শিশুর চোখ ছিলে যেতে পারে।

আরো পড়ুনঃ বাল্যকালে ও কৈশোরে শিশুর পুষ্টি

শিশুদের কান ও নাক পরিষ্কার

শিশুদের কান ও নাক পরিষ্কার করতে কটন বাডস ব্যবহার করতে হবে। শিশুর নাক ও কানে কটন বাডস ঢুকানোর আগে ভালো করে অলিভ ওয়েল কটন বাডসে দিয়ে নিতে হবে।

বাচ্চারা জাগনো থাকতে কখনোই তাদের নাক ও কান পরিষ্কার করা উচিত নয়। তারা ঘুমানোর পরে নাক ও কান পরিষ্কার করতে হয়। তবে পরিষ্কার করার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে কানের পর্দার কাছাকাছি ও নাকে খুব বেশি ভিতরে না যায়।

অনেক সময় শিশুদের নাকে ময়লা জমে নাক বন্ধ হয়ে যায় ফলে তারা শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারে না। তখন তারা দুধ টেনে খেতে পারে না। তার জন্য শিশুদের দুই একদিন পর পরই নাক কান পরিষ্কার করে দিতে হবে এবং খুব সতর্কতার সাথে পরিষ্কার করতে হবে।

আরো পড়ুনঃ অপরিণত বা অকালীয় শিশুর খাদ্য

মালিশ করা

শিশুর শরীর মালিশ করে দিতে হয়। শরীর মালিশ করলে শিশুর ঘুমাতে ভালো লাগে। দেহের রক্ত সঞ্চালন ক্ষমতা বাড়ে ও হজম শক্তি বৃদ্ধি পায়।

বাচ্চাকে গোসল করানোর আগে তার গায়ে ভালো মতো বেবেই ওয়েল লাগিয়ে নিতে হবে। বেবি ওয়েল লাগিয়ে মালিশ করলে শিশু বেশ আরাম পাবে। ফলে শিশুর ভালো ঘুম হবে।

আরো পড়ুনঃগর্ভবতী মায়ের যত্ন

শিশুর যত্ন
শিশুর যত্ন

সূর্যের সংস্পর্শে আনা

প্রাচীন কাল থেকেই শিশুদেরকে সুর্যের আলোতে শুইয়ে রাখার একটা প্রচলন ছিল। সকালের নরম রোদ শিশুদের গায়ে লাগানোর জন্যই তাদের সূর্যের আলোতে রাখা হতো।

এখনো শিশুদেরকে এভাবেই সুর্যের আলোতে রাখা হয়। যাতে তাদের দেহে ভিটামিন ডি লাগে এবং তাদের হাড়ের গঠন ভালো হয়। হাড় শক্ত হয়। এতে শিশুর দেহে ক্যালসিয়াম জোগান দেয়।

আরো পড়ুনঃ স্কুলবয়সী ছেলেমেয়েদের সবচেয়ে কার্যকারী খাদ্যতালিকা

গোসলের সময়

শিশুকে গোসল করানোর সময় খুবই সতর্ক হয়ে গোসল করাতে হয়। নাহলে শিশুর নাকে, মুখ, কানে পানি বা সাবান চলে যেতে পারে। শিশুর গোলস করানোর আগে তার প্রয়োজনীয় সব জিনিস নিজের হাতের কাছে রাখতে হবে।

শিশুকে গোসল করাতে উষ্ণ পানি, সাবান, লোশন ব্যবহার করতে হবে। তারপর শিশুকে একটি তোয়ালে দ্বারা মোছাতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে তোয়ালেটি যেন হয় খুব নরম। তারপর শিশুকে পরিষ্কার কাপড় পড়াতে হবে।

তারপর শিশুকে বেবি লোশন গায়ে আলতো করে মাসাজ করে দিতে হবে। শিশুকে দৈনিক ১২টার আগে গোসল করাতে যাতে শিশুর ঠান্ডা লেগে না যায়।

আরো পড়ুনঃ প্রাকস্কুলবয়সী ছেলেমেয়েদের জন্য সবচেয়ে ভালো খাদ্যব্যবস্থা

ডায়পার পরানো

শিশুর ডায়পার পরিবর্তন করানোর দিকেও খেইয়াল রাখতে হবে। শিশু যেহেতু দুধ খায় তার দিনে তার ৬-৮ টি ডায়পার পরিবর্তন করতে হয়।

শিশুর ডায়পার ভেজা থাকলে তার ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। তার র‍্যাশ বের হতে পারে। যদি র‍্যাশ বের হয়েই যায় তাহলে তাকে ডায়পার ক্রিম ব্যবহার করাতে হয়।

আরো পড়ূনঃ দেখে নিন গরমে কি কি ফল খাবেন

বেবি ওয়াইপস

শিশুর যত্নে খুব ভালো মানের বেবি ওয়াইপস ব্যবহার করতে হবে। বেবি ওয়াইপস ব্যবহার না করলে শিশুর ইচিং বা র‍্যাশ হতে পারে। নজর রাখতে হবে বেবি ওয়াইপস এর ফলে শিশুর কোন ধরনের সমস্যা হচ্ছে কিনা।

আরো পড়ুনঃ শিশুর যত্নে কিছু কথা

নবজাতকের পোশাক

শিশুর পোশাক নির্বাচনের সময় সর্তক থাকতে হয়। শিশুকে সবসময় হালকা রঙয়ের পোশাক পড়াতে হয়। শিশুর পোশাক যেন হয় নরম সুতি কাপড়ের। মোটা, সিনথেটিক কাপড় শিশুকে পড়ানো যাবে না।

আরো পড়ুনঃ শিশুদের করোনা থেকে মুক্ত রাখতে কি করবেন

কোমল ডিটারজেন্ট 

শিশুর জন্য কেনা যেকোন পোশাক, বিছানার চাদর ভালো কোন কোমল ডিটারজেন্ট দিয়ে ব্যবহারের আগেই ধুয়ে নিতে হবে। শিশুর পোশাক সবসময় ভালো মতো জীবাণূমুক্ত করা উচিত।

আরো পড়ুনঃ জন্ডিসে আক্রান্ত হলে খাদ্যব্যবস্থা জেনে নিতে পারেন

শিশুকে সবসময় পরিবারের সবাই মিলে যত্ন নিতে হবে। শিশুর যেকোন সমস্যা দেখা দিলে কোন রকম বিলম্ব না করে তাড়াতাড়ি ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। দরকার হলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে।

শিশুকে সবসময় এভাবেই যত্ন নিতে হবে।

আরো পড়ুনঃ জ্বর হলে করণীয়

Related Articles

Back to top button