পুষ্টি পরামর্শ

হলদে দুধ কিভাবে বানাবেন এবং খাওয়ার উপকারিতা

হলদে দুধের উপকারিতা

হলুদ আমাদের সমগ্র ভারতবর্ষের একটি পরিচিত নাম। হলুদ আমরা বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে থাকি। রান্না-বান্না থেকে শুরু করে চিকিৎসা শাস্ত্র উভয় কাজেই হলুদ ব্যবহার করা হয়। হলদে দুধ আমাদের স্বাস্থ্যের পক্ষ্যে অনেক উপকারি।

হলুদে কিছু স্বাস্থ্যকর পুষ্টি উপাদান থাকে যেমন প্রোটিন, খাদ্যআঁশ, নায়াসিন, ভিটামিন সি, ই, কে, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, কপার, ম্যাগনেসিয়াম এবং জিংক।

হলুদের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, প্রদাহ বিরোধী, ভাইরাস বিরোধী, ব্যাকটেরিয়া বিরোধী, ফাঙ্গাল বিরোধী, ক্যান্সার প্রতিরোধক গুনাগুন থাকার কারনে হলুদে আছে অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা।

হলুদ গুঁড়ো
হলুদ গুঁড়ো

হলুদ এবং হলদে দুধের স্বাস্থ্য উপকারিতা

হলুদ ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে

হলুদের একটি উপাদান টিউমার সৃষ্টিকারী রেডিয়েশনের বিরুদ্ধে কাজ করে। এটি প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। হলুদ ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে যেমন টি-সেল লিউকেমিয়া, কোলন ক্যান্সার এবং স্তন ক্যান্সারের কোষ।

অনিদ্রা দূর করতে

যাদের অনিদ্রার বা ঘুমের সমস্যা রয়েছে তারা কুসুম গরম গোল্ডেন মিল্ক অর্থাৎ হলুদ দুধ রাতে ঘুমাতে যাবার আগে খেলে ভালো উপকার পাবেন।

প্রাকৃতিক অ্যাস্পিরিন

হলুদ মাথা ব্যাথা, ফুলে যাওয়া ক্ষত ও ব্যাথা দূর করতে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ওজন কমাতে এবং নিয়ন্ত্রণে রাখতে

১ চা চামচ হলুদ পেস্ট প্রতি বেলার খাবারে রাখলে ওজন কমাতে এবং স্থূলতা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। হলুদ খাবারের ফ্যাটের বাইল সল্টের ভাঙ্গনের গতি বাড়াতে সাহায্য করে। তাই যদি ওজন কমাতে চান বা নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান তাহলে গোল্ডেন মিল্ক বা হলদে দুধ খান।

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে

হলদে দুধ যেমন ডায়রিয়া প্রতিরোধ করতে পারে ঠিক তেমনি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে। তবে এই ক্ষেত্রেও লো ফ্যাট দুধ ব্যবহার করুন।

আর্থ্রাইটিসের জন্য উপকারী

প্রদাহবিরোধী গুনাগুনের জন্য এটি অস্টিওআর্থ্রাইটিস এবং রিউমাটোয়েড আর্থ্রাইটিসের জন্য উপকারী। হলুদে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের উপস্থিতির কারনে হাড়ের প্রদাহ ও ব্যাথা দূর করতে পারে। এছাড়া এটি ফ্রী রেডিকেলকে ধ্বংস করে যা শরীরের কোষকে নষ্ট করে। হলুদ পেস্ট মালিশ করেও অনেক ধরনের ব্যাথা উপশম হয়।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে

ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় কার্যকরভাবে ইনসুলিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে হলুদ ঔষধের মত কাজ করে। এটি টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদের ইনসুলিন প্রতিবন্ধকতা কমাতে সাহায্য করে।

কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়

কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকলে তা বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি করে। হলুদের এবং হলুদের তৈরি দুধ খেলে তা কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাভাবিক রেখে হৃদরোগ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।

প্রতিরোধক ক্ষমতা বৃদ্ধি করে

হলুদের প্রদাহ বিরোধী, ভাইরাস বিরোধী, ব্যাকটেরিয়া বিরোধী, ফাঙ্গাল বিরোধী বৈশিষ্ট্য প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে।কারন প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হলে ঠাণ্ডা কাশি থেকে শুরু করে বেশির ভাগ রোগ থেকে মুক্ত থাকা যায়। এজন্য হলদে দুধ খুবই উপকারী।

ত্বক উজ্জ্বল ও সমস্যা মুক্ত রাখতে

বিভিন্ন ধরনের ত্বকের সমস্যাতেও হলুদ বেশ উপকারী। এছাড়া এটি মুখের মাস্ক হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। নিয়মিত ব্যবহারে ত্বক হয় উজ্জ্বল এবং তারুণ্যদীপ্ত।

ডায়রিয়ার চিকিৎসায়

হলদে দুধ বদ হজম এবং ডায়রিয়া কমাতে সাহায্য করে। তবে এই ক্ষেত্রে অবশ্যই লো-ফ্যাট দুধ ব্যবহার করতে হবে কারন হাই ফ্যাট দুধ ডায়রিয়া বাড়িয়ে দেবে।

আলঝেইমার রোগ প্রতিরোধে

হলুদ মস্তিস্কের বিভিন্ন প্লাক দূর করতে সাহায্য করে যার ফলে বিভিন্ন মানসিক রোগ হয় যেমন আলঝেইমার প্রতিরোধ করে। হলুদ মস্তিস্কে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়িয়ে মস্তিস্কের কাজকে উন্নত করতে সাহায্য করে এবং আলঝেইমার রোগের গতিকে ধীর করে এবং প্রতিকার করার চেষ্টা করে।

যকৃতের রোগ প্রতিরোধ করে

হলুদ গুরুত্বপূর্ণ এনজাইমের উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে যা যকৃতকে রক্ত বিশুদ্ধ করতে সাহায্য করে। হলুদ দেহের দূষণ দূর করে দেহের সমস্ত বিষাক্ততা দূর করতে সাহায্য করে। এটি রক্ত প্রবাহকে বাড়িয়ে যকৃতের কার্যক্ষমতা বাড়াতেও সাহায্য করে।

কিভাবে বানাবেন গোল্ডেন মিল্ক বা হলদে দুধ

যে গোল্ডেন মিল্ক বা হলদে দুধের এত গুন সেটি কিভাবে তৈরি করতে হবে চলুন তা জেনে নেই। বিভিন্ন ভাবেই হলদে দুধ বানায়। দুধের সাথে সামান্য হলুদ আর গোলমরিচ গুঁড়ো মিশিয়ে ফুটিয়ে নিলেই তৈরি হয়ে যায় গোল্ডেন মিল্ক। এখানে মূল রেসিপি তুলে ধরছি।

গোল্ডেন মিল্ক বা হলদে দুধ
গোল্ডেন মিল্ক বা হলদে দুধ

প্রথম ধাপ

হলুদের প্রাকৃতিক পেস্ট তৈরি

  • ভালো মানের হলুদের গুঁড়ো- ১/৪ কাপ
  • গোলমরিচ গুঁড়ো- আধা চা চামচ
  • বিশুদ্ধ পানি- আধা কাপ

একটি পাত্রে সব উপকরন একসাথে মিশিয়ে মধ্যম আঁচে চুলায় দিয়ে ক্রমাগত নাড়তে হবে যতক্ষণ না একটি ঘন পেস্ট তৈরি হয়। ৭ মিনিটের মত রাখতে হবে। যদি এর মাঝে খুব বেশি শুকিয়ে যায় তাহলে সামান্য একটু যোগ করুন। তারপর সেটি চুলা থেকে নামিয়ে ঠাণ্ডা করে একটি এয়ার টাইট পাত্রে নিয়ে ফ্রিজে রেখে দিন। এই পেস্টটি ২ সপ্তাহের মত রাখা যাবে। বিভিন্ন ধরনের ব্যাথার জন্য আধা চা চামচ প্রতিদিন এই পেস্টটি খেলে উপকার পাবেন। আর খুব বেশি ব্যাথা যাদের থাকে তারা প্রতিদিন ২ বার করে আধা থেকে ১ চামচ করে এই পেস্ট খেলে ৩/৪ দিনের মাঝেই বেশ ভালো একটি ফলাফল পাবেন।

দ্বিতীয় ধাপ

গোল্ডেন মিল্ক বা হলদে দুধ তৈরি

  • কাঠ বাদামের দুধ- ১ কাপ (এর পরিবর্তে নারকেলের দুধ, সয়ামিল্ক,গরুর দুধ বা যেকোনো দুধ দিতে পারেন)
  • রান্নার নারকেল তেল- ১ চা চামচ (এর পরিবর্তে কাঠ বাদামের বা তিলের তেল ব্যবহার করতে পারেন)
  • তৈরি করা হলুদের পেস্ট- ১/৪ চা চামচ বা একটু বেশি
  • মধু- স্বাদ অনুযায়ী

মধু ছাড়া সব উপকরন একসাথে মিশিয়ে একটি পাত্রে নিয়ে মধ্যম আঁচে চুলায় দিয়ে ক্রমাগত নাড়তে হবে এবং ভালো ভাবে গরম হলে নামিয়ে কিছুটা ঠাণ্ডা হতে দিন। কুসুম গরম অবস্থায় মধু মিশিয়ে পান করুন।

গোল্ডেন মিল্ক পানের নিয়ম

গোল্ডেন মিল্ক খেতে হবে খালি পেটে। সকালে ঘুম থেকে উঠে এবং রাতে ঘুমাতে খাওয়ার সময়। এভাবে নিয়মিত ৪০ দিন করে বছরে দুইবার খেলে শরীর থাকবে রোগমুক্ত এবং ত্বক সুন্দর ও উজ্জ্বল হবে।

এছাড়া মাস্ক হিসেবে বা মুখ ধোয়ার জন্য

১/৪ কাপ ফুল ক্রিম দুধ নিয়ে তাতে আধা চা চামচ হলুদ গুঁড়ো মিশিয়ে নিন। তারপর একটি পরিষ্কার কাপড় নিয়ে মিশ্রণে ডুবিয়ে আক্রান্ত স্থানে লাগিয়ে ১০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন।

সতর্কতা

হলুদের মূত্রবর্ধক বৈশিষ্ট্যের জন্য যাদের গলব্লাডারের সমস্যা রয়েছে তারা খাবেন না এবং ডায়াবেটিস এর রোগীরা হলুদ খেতে গেলে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে পরামর্শ নিয়ে খাবেন কারন হলুদ ঔষধের সাথে মিশে অনেক সময় হাইপো গ্লাইসেমিয়া হতে পারে। এছাড়া অনেকের হলুদের অ্যালার্জি থাকতে পারে, তাই যাদের অ্যালার্জির সমস্যা আছে তারা খাবেন না। ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই নন ফ্যাট মিল্ক ব্যবহার করতে হবে।

আরো পড়ুনঃ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
error: Content is protected !!

Adblock Detected

Please turn off your Adblocker.