অন্যান্যরোগতত্ত্ব

হেপাটাইটিসের খাদ্যব্যবস্থা

হেপাটাইটিসের খাদ্যব্যবস্থা

ব্যাকটেরিয়া অথবা ভাইরাসের সংক্রমণ, অথবা বিবিধ জীবাণু ধ্বংসকারী এন্টিবায়োটিক ওষুধ থেকে যকৃতের কোষগুলি ক্ষতিগ্রস্থ হলে, তাকে হেপাটাইটিস বলে। হেপাটাইটিস হলে প্রথম দিকে অরুচি, মাথাঘোরা, ক্লান্তি ও কিছু খেলে পেটের মধ্যে অস্বস্তি বোধ হতে থাকে। পরে বমিবমি ভাব, জ্বর, লিভারে হাত দিলে ব্যথা অনুভূত হয়। দুই সপ্তাহের মধ্যেই চোখ ও দেহের ত্বকে হলুদ আভা দেখা যায়। এই রোগের আরোগ্য হতে যথেষ্ঠ সময়ের প্রয়োজন। এই সময় উপযুক্ত খাদ্যব্যবস্থা করতে পারলে রোগীর অবস্থার দ্রুত উন্নতি সাধন সম্ভবপর হয়।

খাদ্যব্যবস্থাঃ সংক্রমণজনিত বা অন্যান্য যেকোন কারণেই হেপাটাইটিস হোক না কেন, রোগীকে পূর্ণ বিশ্রাম নিতে হয়। এর সাথে যকৃতকে সবল ও কার্যক্ষম করে তোলার জন্য প্রচুর প্রোটিন, শর্করা ও মধ্যম রকম স্নেহের ব্যবস্থা করতে হবে। উপযুক্ত খাদ্য ও বিশ্রাম না হলে লিভার সিরোসিস হবার আশঙ্কা থাকে।

সংক্রামক হেপাটাইটিসের তীব্র অবস্থায় রোগী বিশেষ কিছুই খেতে পারেন না। এসময় চিকিৎসকগণ ইঞ্জেকশনের সাহায্যে পুষ্টি উপাদানগুলি দেহের মদ্ধ্যে ঢুকিয়ে থাকেন।

তীব্র অবস্থা পার হয়ে গেলে রোগী যখন কিছু কিছু খেয়ে সহ্য করতে পারেন তখন থেকেই আরোগ্যকারী খাদ্য বা পথ্যের প্রয়োজন হয়। এই পথ্য উচ্চ প্রোটিন (১০০-১২৫) গ্রাম, উচ্চ শর্করা (৪০০-৪৫০) গ্রাম ও তুল্নামূলকভাবে অল্প পরিমাণ স্নেহযুক্ত হওয়ার দরকার। আগে মনে করা হতো যে যকৃতে চর্বি জমা রোধ করতে হলে খাদ্যের চর্বি একেবারে বর্জন করতে হবে কিন্তু এখন সে যুক্তি ভিত্তিহীন বলে মনে করা হয়। বরঞ্চ খাদ্যকে সুস্বাদু করতে খাদ্যে কিছু স্নেহপদার্থের উপস্থিতি একান্ত বাঞ্চনীয়। তবে এই স্নেহ অবশ্যই অসম্পৃক্ত স্নেহজ এসিডবহুল উদ্ভিজ্জ তেল থেকেই আসা দরকার।

অধিক প্রোটিনঃ এই সময় খাদ্যে অধিক প্রোটিনের প্রয়োজন হয়। এর কারণ খাদ্যে প্রোটিনের পরিমাণ বেশি হলে যকৃত কোষগুলি নিজেদের মেরামতের সু্যোগ পায়। এছাড়া দেহের অন্যান্য স্থানের বিবিধ প্রয়োজন, যকৃতকে যে সমস্ত প্রোটিন তৈরী করতে হতো সেগুলির উপাদান সহজেই পাওয়া যায় বলে যকৃতের উপর চাপও কমে যায়। এ সময় ১০০-১২৫ গ্রাম উচ্চমানের প্রোটিনের ব্যবস্থা করতে পারলে ভালো হয়।

অধিক শর্করাঃ শর্করা জাতীয় খাদ্য অপেক্ষাকৃত সহজপাচ্য। দেহের ক্যালরির চাহিদা পূরণে অধিক শর্করা জাতীয় খাদ্য খেলে, প্রোটিনের উপর চাপ কমে। এতে যকৃতের আরোগ্যের জন্য যথেষ্ট প্রোটিন উদবৃত্ত থাকে। এ কারণে খাদ্যে অধিক শর্করার ব্যবস্থা করতে হয়।

স্নেহঃ অধিক ক্যালরির সরবরাহ করতে হলে কিছু স্নেহপদার্থের উপস্থিতি প্রয়োজন। খাদ্যকে সুস্বাদু ও আকর্ষণীয় করতে এর জুড়ি নেই। জমাট স্নেহ অর্থাৎ চর্বি বর্জন করাই ভালো। অত্যাবশক স্নেহজ এসিডযুক্ত উদ্ভিজ্জ তেল যকৃতের জমা স্নেহজ অপসারণ করতেও সহায়তা করে।

hepatitis

অধিক শক্তি, উচ্চমানের প্রোটিন এবং অল্প পরিমাণের স্নেহযুক্ত খাদ্যের প্রয়োজন। এইরুপ খাদ্যে ৩০০০ কিলো ক্যালরি শক্তি প্রয়োজন।

দৈনিক বরাদ্দকৃত খাদ্যঃ শক্তিমূল্য-৩০০০ কিলোক্যালরি

প্রোটিন- (১০০-১২৫ )গ্রাম

স্নেহ-( ৫০-৬০) গ্রাম

মেনু পরিকল্পনাঃ সারাদিনের মেনু পরিকল্পনা দেওয়া হলোঃ

সকালেঃ- রুটি ২টা (৬০ গ্রাম আটার)

আলু (২৫গ্রাম)

সবজি ( ২৫ গ্রাম)

ডিম ১টা (৪০ গ্রাম)

কলা ১ টা (৫০ গ্রাম)

দুধ ১ কাপ

দুপুরেঃ- ভাত ( ১৫৫ গ্রাম চালের)

মাছ (১২৫ গ্রাম)

আলু ( ৫০ গ্রাম)

শাকসবজি (৫০ গ্রাম)

বিকালেঃ- বিস্কুট বা রুটি- (৬০ গ্রাম আটার )

চিনি বা মধু (৫০ গ্রাম )

ফলের রস ১ কাপ

রাতেঃ- ভাত (১২৫ গ্রাম চালের )

মাংস ( ১২৫ গ্রাম )

শাকসবজি (২৫ গ্রাম )

আলু ( ২৫ গ্রাম )

দুধ ১ কাপ

যাদের ২০০০-২৫০০ গ্রাম কিলোক্যালরি শক্তির প্রয়োজন, তারা সমস্ত আহার্য থেকেই কিছু কিছু কমিয়ে বরাদ্দকৃত খাদ্যের তালিকা প্রস্তুত করতে পারবেন। সেরকম আহার্যে চর্বির পরিমাণও এক-তৃতীয়াঙশ কমে ৪০ গ্রাম হবে। এই তালিকার সাহায্যে হেপাটাইটিস ও সিরোসিস উভয় প্রকার রোগের পথ্য প্রস্তুত করা হয়।

রোগীর খাদ্য প্রস্তুতের সময় নিম্নলিখিত বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখতে হবেঃ

১। সকল খাদ্যগোষ্ঠী থেকে খাদ্য নির্বাচন করতে হবে।

২। খাদ্য প্রস্তুতের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে, খাদ্য যেন সুস্বাদু ও তৃপ্তিকর হয়। বেশী ভাজা খাদ্য গুরুপাক বলে তা পরিহার করা উচিত।

৩। অম্ল সেলুলোজযুক্ত ও সহজপাচ্য ফল নির্বাচন করতে হবে।

৪। যেসকল শাকসবজি গ্যাস উৎপাদন করে সেগুলো বর্জন করে সহজপাচ্য ও নরম শাকসবজি নির্বাচন করতে হবে।

যেসকল খাদ্য বর্জন করতে হবেঃ

স্নেহঃসকল প্রকার চর্বি ও ভাজা খাবার যেমনঃসিংগারা, পরোটা, লুচি, ডালপুরি ইত্যাদি

মাছ-মাংসঃ বেশি তৈলাক্ত মাছ যেমন-ইলিশ, পাঙ্গাস, বড় রুই, খাসীর মাংস

শাক-সবজিঃ গ্যাস উৎপাদনকারী শাকসবজি যেমন-পিয়াজ, ওলকপি, বাধাকপি, শসা, মূলা।

ফলঃ বেশী আশযুক্ত ফল.

পানীয়ঃ এলকোহল

মশলাঃ মরিচ, সর্ষে ইত্যাদি কড়া স্বাদের মশলা

যে সকল খাদ্য খাওয়া যাবেঃ

স্নেহঃ মাখন ,সয়াবিন তেল

ডিমঃ সিদ্ধ, পানি পোচ

মাঙ্গসঃ কলিজা, বাচ্চা গরুর মাংস, মুরগী, সকল চর্বিহীন মাছ

শাক-সবজিঃ টমেটো, গাজর, মটরশুটি, সিম, পালনশাক।

মিষ্টিঃ চিনি, গুড়, মধু, জ্যাম, জেলী

মশলাঃ জিরে, হলুদ, লবণ( খুব অল্প পরিমাণে)

আরো পড়ুনঃ

রক্তের উচ্চচাপ ও খাদ্যব্যবস্থা

বদহজম ও খাদ্যব্যবস্থা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
error: Content is protected !!

Adblock Detected

Please turn off your Adblocker.